01/07/2026
কক্সবাজার জেলার স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ প্রয়োজন
লেখক : ছৈয়দ আহমেদ তানশীর উদ্দিন
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ (ক) অনুসারে চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। স্বাধীনতার পর থেকে, বিশেষ করে ২০০২-২০০৬ সালে জেলার স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালের শয্যা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ সরকারী স্বাস্থ্য সেবার ব্যাপ্তি ও পরিধি সম্প্রসারিত হয়েছে বিশেষ উদ্যোগে মাধ্যমে গ্রামীণ জনগনের দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রাগুলির বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ইপ্সিত সাফল্য অর্জিত হয়েছে। কিন্তু বহুলাংশে উপেক্ষিত রয়েছে সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে গড়ে উঠেনি সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা। এটি সত্য যে ,শেষ পর্যন্ত একটি দেশের জনগণকে তার চিকিৎসা সেবার জন্য তার নিজ দেশের চিকিৎসকের কাছেই ফিরতে হয়। সাম্প্রতিক করোনাকালে নিজ দেশের চিকিৎসক, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি এত অনাস্থা, ঘৃণার পরেও ব্যবসায়ী, বিত্তবান, সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনীতিবিদ নিজ দেশের হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমাদের সংকটের গভীরে যেতে হবে।
জেলায় বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থা :
দেশের প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজার। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এখানে নিত্যনতুন আধুনিক ও বিলাসবহুল অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, বাড়ছে শিল্পায়নও। এসব কারণে বাড়ছে জেলায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা। এখানে অস্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যাও নেহাত কম নয়। কয়েক বছর ধরে এ জেলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৩-১৪ লাখ মানুষ বাস করছে। পর্যটনে চকচকে অবকাঠামোর বিপরীতে জেলার চিকিৎসা পরিষেবা পড়ে আছে সেই মান্ধাতা আমলে, রুগ্ন দশায়। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এ জেলার সাধারণ মানুষসহ দেশী-বিদেশী পর্যটক।
সরকারি হিসাবে কক্সবাজার জেলায় মোট জনসংখ্যা ২৭ লাখ ৯০ হাজার। প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ পর্যটক, কয়েক লাখ অস্থায়ী বাসিন্দার পাশাপাশি ১৩-১৪ লাখ রোহিঙ্গাসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার কর্মী মিলিয়ে কক্সবাজারে বসবাসকারীর সংখ্যা ৪৫ লাখের বেশি। কিন্তু এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি হিসাবে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা মাত্র ৫৮৬। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২৫০ শয্যাই মূল শহরের বাসিন্দাদের চিকিৎসাপ্রাপ্তির প্রধান ভরসা। তাছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামে এটি একমাত্র চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র তাই কক্সবাজার জেলা বাদে ও বান্দরবান জেলার রোগীরা এখানে সেবা গ্রহন করে। এই সেবাকেন্দ্রে শুধু জরুরি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৫শতাধিক রোগী সেবা নিতে আসে। মাত্র তিনজন চিকিৎসক তাদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
এমন পরিস্থিতিতে জটিল কিংবা সাধারণ রোগেও কক্সবাজারবাসীকে চিকিৎসা নিতে ছুটতে হয় চট্টগ্রামে শহরে, কক্সবাজার মূল শহর থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১৬০ কিলোমিটার।
কক্সবাজার মেডিক্যাল ট্যুরিজমের নতুন খাত:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন কক্সবাজার স্বাস্থ্য পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।‘কক্সবাজারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে এখানে বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা বা স্পেশালাইজড হেলথ কেয়ার গড়ে তোলার পরিকল্পনা দরকার প্রয়োজনে এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে শুধু স্থানীয় মানুষই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ চিকিৎসার জন্য কক্সবাজারে আসবেন।
পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালের মাধ্যমে সেকেন্ডারি (বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা হাসপাতালের সেবা)
ও টার্শিয়ারি (উচ্চতর ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা) স্বাস্থ্যসেবাও উন্নত করা তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো কক্সবাজারকে একটি বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। আগামী দশ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কক্সবাজারে পর্যটনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নির্ভর পর্যটনও গড়ে তোলা সম্ভব। চোখ, কিডনি ও হার্টসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আধুনিক কেন্দ্র ও যোগ (ইয়োগা) সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।
এতে স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন একে অপরকে শক্তিশালী করবে ফলে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন স্থানীয় মানুষ।এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কক্সবাজারে একটি বিশেষায়িত স্বাস্থ্য অঞ্চল গড়ে তোলার আধুনিক পরিকল্পনা জরুরি ; সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে কক্সবাজার শুধু পর্যটন নয়, স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত হবে। আশার কথা হল:
চলতি বছরের মার্চ মাসে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন হলরুমে অনুষ্ঠিত কক্সবাজারে স্বাস্থ্য পর্যটন উন্নয়নকল্পের মতবিনিময় সভায় বিনপির বৃহৎ পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার।
মেডিক্যাল ট্যুরিজম হলে চিকিৎসায় বিদেশমূখীতা কমবে :
বিশ্বব্যাংক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্রস বর্ডার ডেটা ফ্লো গবেষণা বলছে , বাংলাদেশিরা বিদেশে চিকিৎসার জন্য বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি।বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন তথ্যমতে ২০২৩ সালে চার লাখ ৪৯ হাজার ৫৭০ জন বাংলাদেশি স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিদেশ ভ্রমণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেশি।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের যেসব দেশ থেকে বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য অন্য দেশে যায়, এমন ১০টি দেশের মধ্যে শীর্ষ ইন্দোনেশিয়া। এই তালিকার ১০ নম্বরে বাংলাদেশ। অন্য দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইতালি, জার্মানি, লেসোথো, দুবাই ও লিবিয়া।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশমুখী রোগীদের ৫১ শতাংশ যায় ভারতে। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে যায় ২০ শতাংশ করে। যুক্তরাজ্যে রোগী যাওয়ার হার ৩ শতাংশ। ২ শতাংশ করে যায় জাপান ও মালয়েশিয়ায়। ১ শতাংশ করে যায় চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে। এই তথ্য অনুযায়ী সহজে অনুমেয় চিকিৎসায় বিদেশ নির্ভরতা আমাদের দেশথেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে যাচ্ছে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা এই অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারি।
মেডিক্যাল ট্যুরিজম কক্সবাজার করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসমূহ:
• বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো: কক্সবাজারে উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক হাসপাতাল এবং বিশেষায়িত ইউনিট (যেমন: বার্ন ইউনিট, কার্ডিওলজি ও ক্যাথল্যাব )স্থাপন করা
• দক্ষ জনবল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক: দেশী-বিদেশী অভিজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স এবং টেকনিশিয়ান নিশ্চিত করা।
• সহায়ক অবকাঠামো ও হোটেল: রোগীদের জন্য হুইলচেয়ার ফ্রেন্ডলি হোটেল এবং হাসপাতালের পাশে বিশেষ আবাসন ব্যবস্থা করা।
• যাতায়াত ও নিরাপত্তা: পর্যটকদের জন্য সহজ যাতায়াত (বিমান ও উন্নত সড়ক পথ) এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
• ডিপ্লোম্যাটিক ও আইনি সহায়তা: বিদেশী রোগীদের ভিসার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক বীমা সুবিধা নিশ্চিত করা।
• মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং: 'চিকিৎসা ও ভ্রমণ' একসাথে এই ধারণাটি প্রচার করা এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তুলে ধরা।
এছাড়াও, স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটকদের সেবার মানোন্নয়নে হোটেল মালিক, পর্যটন পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এইক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কাজ করা যেতে পারে।
(ক) দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য হাসপাতাল ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন:
(খ) দরিদ্র জনসাধারণের পকেট থেকে স্বাস্থ্য সেবায় ব্যয় হ্রাস এবং সেবা গ্রহণে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ;
(গ) স্বাস্থ্য খাতে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য রোগী ও চিকিৎসার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দের নিয়ম চালু করা;
(ঘ) সেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি; এবং
(ঙ) স্থানীয় পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব/ক্ষমতা বৃদ্ধি।
পরিশেষে বলি, একটা দেশের একটা দেশের স্বাস্থ্য পদ্ধতি কেমন হবে, কীভাবে কাজ করবে তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেই দেশটির নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কীভাবে নির্মিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং পুরো সিস্টেমের আচরণ। অতএব, নীতিনির্ধারক ও জনগণের অগ্রগামী অংশকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক দোষারোপ বা আত্মপক্ষ সমর্থনে সমাধান নাই। আমাদের দুর্বলতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সঠিক নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য যথাযথ বিনিয়োগ।
লেখক : নার্স ও পুষ্টিবীদ,কক্সবাজার
[email protected]