04/06/2026
সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও জ্ঞানপিপাসার এক অনন্য অনুপ্রেরণার নাম — কফিল উদ্দিন আহমদ
২০০৭ সাল। চট্টগ্রাম কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ক্লাস শেষ। সহপাঠীরা যখন চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন এই বিভাগেরই একজন শিক্ষার্থী জীবনের এক ভিন্ন পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। কিন্তু একজন স্কুলশিক্ষক পিতার পক্ষে বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় বহন করা সহজ ছিল না।
তবে স্বপ্নের কাছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা হার মেনেছিল তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে। টিউশন ফি ছাড়াই বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ লাভ করেন তিনি এবং মাত্র ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে—যার মধ্যে বিমান ভাড়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল—পাড়ি জমান ফিনল্যান্ডে।
নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ, কনকনে ঠান্ডা আর নানান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু নিজের লক্ষ্য ও স্বপ্নের কথা মনে করে তিনি আবারও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যান। ফলস্বরূপ, সহপাঠীদের ভোটে তিনি ক্লাসের Best Student নির্বাচিত হন।
২০১২ সালে তিনি বিবিএ সম্পন্ন করেন ফিনল্যান্ডের বৃহত্তম ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস থেকে। একই সঙ্গে অর্জন করেন Ambassador Award, যা প্রতি বছর বিজনেস স্কুলের মাত্র একজন শিক্ষার্থীকে প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। লুক্সেমবার্গভিত্তিক European Investment Bank-এ ট্রেইনিশিপ সম্পন্ন করেন, যা একজন বাংলাদেশির জন্য অত্যন্ত বিরল অর্জন। এছাড়া ব্যাচেলর পর্যায়ে ইন্টার্নশিপ করেন International Organization for Migration (IOM), Finland-এ। পরে পোল্যান্ডে একটি আমেরিকান প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর বর্তমানে আয়ারল্যান্ডের একটি গ্লোবাল ব্যাংকে Automation Engineer হিসেবে কর্মরত আছেন।
পূর্ণকালীন চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি। জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর অদম্য আগ্রহ তাঁকে একের পর এক উচ্চশিক্ষার সোপানে পৌঁছে দিয়েছে।
২০২২ সালে আয়ারল্যান্ড থেকে Postgraduate in Applied Statistics
২০২৫ সালে সুইডেন থেকে (Distance Learning) MSc in Information Systems
২০২৬ সালে সুইডেন থেকে (Distance Learning) MSc in Informatics
ভ্রমণও তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ। এ পর্যন্ত তিনি বিশ্বের ২৯টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশসহ তিনটি দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন।
জ্ঞানকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। মাইক্রোসফট এক্সেল বিষয়ে তাঁর লেখা “Start to Excel” বইটি প্রকাশিত হয়েছে এবং বর্তমানে রকমারিতে পাওয়া যাচ্ছে।
বলছিলাম চট্টগ্রাম কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের (২০০২ ব্যাচ) কৃতী শিক্ষার্থী -এর কথা।
বিদেশে পড়তে গিয়ে অনেকেই পড়াশোনার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হন। কিন্তু তাঁর কাছে অর্থের মূল্য নয়, জ্ঞানের মূল্য ছিল সর্বাধিক। একসময় যখন ১ ইউরোর মূল্য ছিল প্রায় ৮০ টাকা, তখনও তিনি পড়াশোনাকেই জীবনের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি একাধিক মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়—সবকিছুই তাঁর অসাধারণ সময় ব্যবস্থাপনা, অধ্যবসায় এবং জ্ঞানার্জনের প্রতি নিবেদনের প্রমাণ বহন করে।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন, তাঁর নিজের ভাষায়, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাস্টার্স পর্যন্ত টিউশন ফি ছাড়াই পড়াশোনা সম্পন্ন করতে পারা।
স্বপ্ন দেখতে জানলে, পরিশ্রম করতে পারলে এবং লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হলে—সাধারণ পরিবার থেকেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। কফিল উদ্দিন আহমদের জীবন সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ।