07/10/2025
আজ দৈনিক যায় যায় দিন পত্রিকায় কলাম।
ধন্যবাদ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।
কেউ মরে বেঁচে যায়, কেউ বেঁচে থেকেও মরে প্রতিদিন
শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফারুক হোসেন বুধবার ০৩/০৯/২০২৫ খ্রি. ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন।
তার স্ত্রী শারমিন আক্তার জানান তার স্বামী ঋণের বোঝা আর মানসিক চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। শিক্ষক ফারুক হোসেন দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিস রোগে ভুগছিলেন। এক হাত সম্পূর্ণ অবশ থাকায় তিনি চিকিৎসার জন্য এনজিও, সমবায় সমিতি এবং এবং স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে একাধিকবার ঋণ গ্রহণ করেন।বেতনের বেশিরভাগ অর্থই চলে যেত সুদ পরিশোধ করতে।ফলে, সংসারের অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হয়ে পড়ছিল।
দরিদ্রতা আর ঋণের বোঝা তাকে ঠেলে দিয়েছিল স্বেচ্ছা মৃত্যুর দিকে।
সকল দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হবার জন্য এবং পরিবারকে মুক্তি দেবার জন্য অবশেষে একজন শিক্ষকের প্রাপ্তি আত্মহত্যা।
এই শিক্ষক কি আমাদের লজ্জা দিতে চেয়েছিলেন? আমরা তো লাজ লজ্জা ভুলেছি সেই কবেই!
পরীমনি, বুবলি, অপু, হিরো আলমের মত গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের বিয়ের খবরের চেয়ে এই শিক্ষকের চলে যাবার খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, মিডিয়ায় তেমন গুরুত্ব পায়নি।
শিক্ষক ফারুক হোসেন মরে বেঁচে গেছেন। সকল দুঃশ্চিন্তা, অসম্মান, অপমান থেকে চিরতরে মুক্তি পেয়েছেন। সংসারের সদস্যদের একটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দিতে না পারার লজ্জা থেকে মুক্তি পেয়েছেন কিন্তু আমরা যারা শ্বাস নিচ্ছি, হাঁটছি, খাচ্ছি তারা কি বেঁচে আছি?
আমাদের নৈতিক মৃত্যু হচ্ছে বারবার।এ মৃত্যু হচ্ছে নীরবে লোকচক্ষুর অন্তরালে।
সন্তানদের লেখাপড়া, বারবার অসুস্থ হওয়া, অপারেশন খরচসহ নানা ধরণের খরচের কারণে ব্যক্তিগত লোন, ব্যাঙ্ক লোনসহ বিভিন্ন ধরণের লোন পরিশোধের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে লোনের জন্য আবেদন করি। জনৈক শিক্ষা কর্মকর্তা, যিনি এক সময় গর্ব করে বলতেন, হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তিনি। সেই কর্মকর্তা আবেদনপত্রে অনুমতি প্রদানের জন্য স্বাক্ষর করতে লাখ প্রতি প্রায় দেড় হাজার টাকা দাবি করেন। মোট সাত লাখ টাকা লোন তুলতে প্রায বিশ হাজার টাকা খরচ।
আমার নিজের টাকা আমার প্রয়োজনে তুলতে শিক্ষা কর্মকর্তা, শিক্ষা অফিসের কেরানি ( এখন যারা স্যার হয়েছেন), এজি অফিস সহ জায়গায় জায়গায় ঘুষ দিতে হবে।
প্রায় অর্ধশত শিক্ষক সংগঠন এই অনিয়ম রোধে নির্বিকার। বরং এই ধরণের কর্মকর্তাদের স্যার স্যার করতে করতে তাদের মুখে ফেনা উঠে যায়। ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করা, স্কুলে দাওয়াত দিয়ে পঞ্চাশ প্রকার ব্যাঞ্জন দিয়ে আপ্যায়ন করা, দামী পোশাক উপহার দেওয়া এসব গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা থেকে বের হতে পারেন না শিক্ষকবৃন্দ।
এই কর্মকর্তার আজানের সাথে সাথে জায়নামাজ খোঁজার দৃশ্যটাও ছিল দেখার মতো। সেই সঙ্গে হালাল রুজির উপদেশ।
এইসব নষ্ট, ভ্রষ্ট কর্মকর্তাদের সহ্য করে বছরের পর বছর আমরা চাকুরি জীবন অতিবাহিত করছি। আর বারবার আমাদের নৈতিক মৃত্যু হচ্ছে।
এ সমাজে উপদেশ দেবার লোকের অভাব নেই। বহুবার শুনতে হয়েছে,শিক্ষকতা মহান পেশা। এ পেশাকে টাকার মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করা ঠিক না।
শিক্ষকতা যদি মহান পেশা হয় তাহলে বিসিএস ক্যাডার না হয়ে আসেন শিক্ষকতা করেন। টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করা ঠিক না হলে শিক্ষক কি হাওয়া খেয়ে বাঁচবেন?তার সংসার, সন্তান সততার ভাজি, চচ্চড়ি, জুস খাবে?
শিক্ষকতা যদি সেবামূলক পেশা হয় তাহলে রাজনীতি কেন করেন? ভোটে জিতে কেন সেবা করার বাসনা পোষণ করেন? আসুন দলে দলে প্রাথমিকের শিক্ষক হয়ে মহান, সেবামূলক পেশায় অংশগ্রহণ করে দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং নিজের পরকালকে পুণ্যময় করে তুলুন।
একটা স্বাধীন দেশের অর্ধশত বছরের বেশি অতিক্রম হবার পরও শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক স্তরের সমস্যা সমাধান না হয়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে।
আগে কথায় কথায় সবাই বলতো, এসএসসি পাশ শিক্ষক। এখন শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। মেধাবীদের অপমান, অসম্মানের এক পৈশাচিক আনন্দ আছে। প্রমোশনবিহীন পেশা, ঝাড়ুদারের সমতূল্য বেতন, নষ্টদের উপদেশ নানা ধরণের মানসিক নির্যাতন সহ্য করে কেন লক্ষ লক্ষ শিক্ষক অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে জাতিকে, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলে মাথা অবনত করতে বাধ্য হবেন এ দেশের মানুষ।
সম্প্রতি এক সংবাদে জানলাম, মাধ্যমিক পর্যায় আইসিটি ট্রেনিংয়ে বিদেশে যাচ্ছে ১৯ জনের একটি দল। সেখানে যাচ্ছেন পরিচালকের স্ত্রী, শ্যালিকা। ১৯ জনের সেই টিমে শিক্ষক মাত্র একজন।
একমাত্র প্রাথমিক ছাড়া শিক্ষার প্রতিটি স্তরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হবার জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা লাগে। প্রমোশন পেয়ে শিক্ষকদের মধ্য থেকেই প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, উপাচার্য নিয়োগ প্রাপ্ত হন। শুধুমাত্র প্রাথমিক স্তরেই সহকারী শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা, শ্রম, নিষ্ঠা সবকিছুকে উপেক্ষা করে তাদের অসম্মান করে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয় অভিজ্ঞতাবিহীন প্রধান শিক্ষক।
চলতি দাযিত্ব, ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দশ, পনেরো বছর পার করেও সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক হবার কোনো সুযোগ থাকে না। সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া পনেরো দিনের ট্রেনিং নিয়ে প্রধান শিক্ষক হয়ে চেয়ারে বসেন। বিশ পঁচিশ বছর যাবৎ যারা শিক্ষকতা করছেন তারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকেন একই স্থানে। নিঃসন্দেহে এটা অপমান, অসম্মান।
নবুয়ত প্রাপ্তির জন্য যেমন ৪০ বছর লাগে তেমন একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হবার জন্যও বয়স, অভিজ্ঞতা জরুরি।
তবে কি সুকৌশলে শিক্ষাকে ধ্বংস করার জন্য, প্রাথমিক স্তরকে নড়বড়ে করার জন্য এই পদ্ধতি?
সব দোষ নন্দ ঘোষের মত প্রতিটি ব্যর্থতার দায় শিক্ষকদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়। একজন মেধাবী শিক্ষককে এই পেশায় ধরে রাখার জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছে রাষ্ট্র?
শিক্ষক হবার সময় শর্ত দিবেন স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শিক্ষাগত যোগ্যতার অথচ আচরণ দেখাবেন এসএসসি শিক্ষাগত যোগ্যতার এটা কি হওয়া ঠিক!
এই যে নৈতিকতার প্রতিদিনের মৃত্যু থেকে ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে উঠি, প্রতিদিনই জন্মাই নতুন করে, এরই মাঝে একদিন ঠিকই পরিবর্তন আসবে। পাদটীকা গল্পের পন্ডিতমশাই অথবা তালেব মাস্টারের জীবন বহন করা শিক্ষকদের জীবনমান উন্নত দেশের শিক্ষকদের মত উন্নত হবে, পছন্দের তালিকায় প্রথম স্থানে থাকবে প্রাথমিকে শিক্ষকতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ শেষ বয়সে শিশুদের সান্নিধ্য পাবার জন্য আসবেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে -- এইদিন একদিন অবশ্যই আসবে। সেদিন প্রাথমিকের শিক্ষকদের নেওয়া হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে অভিজ্ঞতা বলার জন্য। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে শিক্ষকতার অনার্স, মাস্টার্স। সেখানে যারা সবচেয়ে ভালো ফলাফল করবে তারাই প্রাথমিকের শিক্ষক হবেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমার এই চাওয়া অসম্ভব মনে হলেও দেশ একদিন পাল্টাবে। এই দেশ একদিন মানুষের হবে। সেই মানুষের দেশে তৈরি হবে মানুষ তৈরির শিক্ষক। শিক্ষকের সম্মূখে অবনত শিরে দাঁড়াতে শিখবে জাতি।
কলমে: শাকিলা নাছরিন পাপিয়া