Nusrat Jahan Nipa

Nusrat Jahan Nipa �লা ইলাহা ইল্লাল্লাহূ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ�

06/03/2024

পর্ব-৩৮

৬৭.
একদিন জমিদার শাহনেওয়াজ মহলে ফিরল না। সিন্ধুর কাছেই ছিল। বেগম সুগন্ধ্যাও নিজের মতো ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত। সন্ধ্যা হলেই দরজায় খিল দেয়। অন্দরমহল একপ্রকার ফাঁকা হয়েই থাকে। মাশহুদা বেগমের বিশ্বস্ত কর্মী জবেদা সব দিক নিশ্চিত করে মাশহুদা বেগমের যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন ইংরেজ কুঠিতে। রাত্রির মধ্যভাগে সেখানে উপস্থিত হলেন মাশহুদা বেগম। তৎকালীন নিয়োগ প্রাপ্ত ইংরেজ কমান্ডার লুইস সাদরে গ্রহণ করলেন সবাইকে। তারা যেন এই অপেক্ষাতেই ছিল। মাশহুদা বেগমের ভোজনের আয়োজন করলে তিনি এক বাক্যে না করলেন। বললেন,
-‘জরুরী তলব কী দরকারে! সেটা বলুন!’
লুইস হেসে বলল,
-‘ইউর এক্সিলেন্সী! দ র কা র পড়েইছে দেখ এই তো ডেক এইছি।’
-‘কী ব্যপারে!’
-‘আপনার সান আই মিন শা হা নেজ..
-‘শাহনেওয়াজ।’
-‘ইয়াহ। তিনি আমাদের কাজেইই বাঁধা দিচ্ছেন। আমরা গোটা অঙ্কের অ্যামাউন্ট অফার করেইছি বাট হি ডিড নট এক্সেপ্ট ইট। তিনি আমাদের ব্যবসার লস করছে। এই মুহূর্ত গোটা দেশের প্রধানেরা তার উপর রে গে আছে। খুব দ্রুত তারা একটা পরামর্শ নিবে। আপনার সান এর কারণে আপনার পুরো জমিদার বাড়ি ক্ষ’ত’ম হয়ে যাবে। আপনার হাসব্যান্ড এর এত কষ্টের ল্যান্ড আপনি কীভাবে হারিয়ে যেতে দিচ্ছেন! ইট ইজ সো আনফেয়ার।’
-‘আপনি কী বলতে চাইছেন! আমার ছেলের কারণে কী হবে!’
এবার এক বাঙালী লোক কথা বললেন। তিনি এতক্ষণ বসেই ছিল। তাদের কথা শুনছিল। দেখে মনে হচ্ছে সব এক দলের। মাশহুদা বেগমের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন,
-‘বেগম সাহেবা! জমিদার ভুল পথে হাঁটছে। আত্ম অহংকার এর বশে আপনার ভিটে মাটি নষ্ট করছে। এই যে দেখুন! তার উপর এখন রাজা, নবাব, ইংরেজ, ফরাসি সবাই চটে গেছে। যে কোনো দিন যে কোনো কিছু হতে পারে। দেখা গেল তারা যুদ্ধে নামবে তখন এই এত বড় সৈন্যের কাছে হেরে আপনার পুত্রকেই খেসারত দিতে হবে। সবাই তার থেকে তার জমিদারি ছিনিয়ে নিবে। নিস্ব করে দিবে তার পুরো বংশ। তাই এখনও সময় আছে, তাকে বোঝান আপনি। আর যদি সে না বুঝতে চায় একটাই পথ আছে। সব হারাতেই হবে।’
-‘কী বলছেন! এর জন্য আমার বংশ পরম্পরার জমিদারি কেন ছিনিয়ে নিবেন!’
-‘এটাই করতে হবে। আর কোনো কিছু করার নেই। অবশ্য আরেকটা পথও খোলা আছে।’
-‘কী!’
এবার লুইস টেবিলে দুই হাত রেখে শ’য়’তা’নি হাসি দিয়ে বলল,
-‘কি’ল ইউর সান।’

বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো মাশহুদা বেগম। কথাটা শুনেই অন্তরআত্মা কেঁপে উঠল তার। সে বলল,
-‘মশকরা করছেন নাকি! এটা কেমন কথা!’
বাঙালি লোকটাও উঠে এলো বসা থেকে। বলল,
-‘দেখুন! আজ নয়তো কাল ব্রিটিশদের গু’লি খেয়েই তাকে ম’র’তে হবে। যার ফলে আপনা আপনি সকল কিছু ব্রিটিশ সরকারের কাছে চলে যাবে। তাই আগে আগেই আসল কাজটা সেরে নিলে সবই ঠিক থাকে। আপনার নাতি তো আছে! ভবিষ্যৎ জমিদার! তার বড় হওয়া পর্যন্ত না হয় আপনি সামলালেন সব। সমস্যা কোথায়?’
-‘আপনাদের মাথা খারাপ! আমি নিজে হাতে পুত্র হ’ত্যা করব? আমি! এটা কখনোই সম্ভব না। কখনোই না।’

মাশহুদা বেগম বের হয়ে আসতে নিলেই লোকটি এবার জোর গলায় বলল,
-‘শুনেছি আপনার পুত্র সাঁপুড়ে কন্যা বিবাহ করেছে। এখন যদি পাঁচ কান হয় তাহলে সম্মান থাকবে কিছু আপনাদের! এমনিতেও লোকজন দূর ছাই করবে। ভেবে দেখুন আরেকবার বে গ ম সাহেবা! আর আপনার পুত্রও কেমন! মায়ের আজ্ঞা পালন করে না। একবারও নিজের পিতৃকূলের কথা ভাবল না। নিজের স্ত্রী সন্তানের কথা ভাবল না। কলিযুগের এই এক দশা। এক্কেবারে অধঃপতন।’

পরমুহূর্তেই কীসের বশবর্তী হয়ে কে জানে! মাশহুদা বেগম এই কু’চ’ক্রী’দের দলে ভিড়লেন। আত্ম অহংকার এবং ক্ষোভের জন্য এটা ভুলে গেলেন শাহনেওয়াজ তার কী! নিজের অহমিকা টিকিয়ে রাখতেই সে এই নিকৃষ্ট খেলায় নামে।

৬৮.
সিন্ধুর এখন নয় মাস চলছে। পেটের ভারে নুয়ে থাকে। তবে তার ভেতরের আনন্দ যেন সবসময় উপচে পড়ে। আর অল্প কিছুদিন! তার পরেই তো নতুন মানুষের আগমন ঘটবে। কী দারুন ব্যাপার।

তবে একটা ভ’য় আতঙ্ক ও সর্বদা তাকে ঘিরে রাখে। জমিদার তার নিজস্ব দল বল আর মিত্রদের সহায়তায় ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে ছোট খাটো এক যু’দ্ধে’র ঘোষণা করেছে। এই নিয়ে আজ তিন চারদিন তাদের মধ্যে সংঘ’র্ষও চলছে। তবে এখনও কারো নি’হ’তের খবর আসেনি। তবে বোঝা যাচ্ছে জমিদার জিতবে। কেননা প্রত্যয় শাহ্ তো যু’দ্ধ ময়দানে ছিল এখন শেখ মৃত্যুঞ্জয় ও যোগ দিয়েছেন। শাহনেওয়াজ তো আছেই! তবুও কেন যেন এসব সিন্ধুর ভালো লাগছেনা। তার মনে উল্টা পাল্টা চিন্তা আসে।

তার এই অবস্থা দেখে মৃত্যুঞ্জয় বলল,
-‘আপনাকে এমন চিন্তিত মানায় না। শুনেছি আপনার আগে খুব তেজ ছিল। এখন সেসব কোথায় ভরলেন? সাহসী হচ্ছেন না কেন? মন শক্ত রাখুন। অবশ্য এটাই সমস্যা। প্রেম ভালোবাসায় মানুষের বোধ-বুদ্ধি, চিন্তা-চেতনা লোপ পায়। তবে মনে রাখবেন- The meaning of life is to find your gift. The purpose of life is to give it away. এটা উইলিয়াম শেক্সপিয়ার এর উক্তি। উপলদ্ধি করতে পারলে বুঝবেন এটা আসলে কতটা সত্য। এইটার মর্মার্থ চরম সত্য।’
-‘আপনি এমন করে কেন বলছেন? আপনার থেকে কী নিয়ে নিয়েছে? একটু বলবেন?’
-‘অবশ্যই বলব। আমার থেকে আমার ভালোবাসার সুগন্ধী নিয়ে গেছে এই জীবন। তার সুঘ্রাণটাও আমি এখন আর পাই না।’
-‘আপনার মতো একজনকে কে পায়ে ঠেলতে পারে! আপনার সে কী ছেড়ে গেছে নাকি কোনো ভাবে হারিয়ে ফেলেছন!’
-‘আফসোস এইখানেই। সে কখনোই আমার ছিল না।’

এর বিপরীতে সিন্ধুর আর কিছু বলার ছিল না। জীবন! বড়ই বিচিত্র। কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়।

———–
জমিদার শাহনেওয়াজ তার মা-য়ের কক্ষের আরাম কেদারায় বসে আছেন। মাশহুদা বেগম জরুরী তলব করেছেন তাকে। কী ব্যাপারে সেটা বসে বসে ভাবছেন তিনি। অবশেষে মাশহুদা বেগম এলেন। বসা থেকে দাঁড়িয়ে মাকে সালাম করলেন শাহনেওয়াজ। সালাম নিয়ে তিনি শক্ত গলায় বললেন,
-‘এসব কী শুরু করেছ? ইংরেজ এর বিরুদ্ধে কেন লাগছ?’
-‘আপনাকে আগেও বলেছি আম্মাজান। এটার দরকার আছে।’
-‘আমি দেখছি না আহামরি দরকার। ক’বিঘা জমি ছেড়ে দিলে কি ক্ষতি হতো!’
-‘গরীব চাষারা এসব আ’ফি’ম চাষ করে পাবে কী আর খাবে কী? তাছাড়া জমির উর্বরতা নষ্ট করছে। আমি কীভাবে আমার আপনজনদের এমন বিপদে ফেলি আম্মাজান! আপনি তো এমন শিক্ষা দেননি আমায়।’
-‘কখনো কখনো শিক্ষা সংস্কৃতি ভুলতে হয় নিজ স্বার্থের জন্য। তোমার জীবনের নিশ্চয়তা দেখছি না এ ক্ষেত্রে।’
-‘যে জীবনে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে হয় সেই জীবন না হয় আমি স্বেচ্ছায় উৎসর্গ করলাম। সমস্যা কোথায়?’
-‘তুমি বলছ ম’র’তেও আপত্তি নেই।’
-‘না, নেই।’
-‘বেশ। তুমি ঐ মেয়ে কে কবে ছাড়বে?’
-‘কার কথা বলছেন!’
-‘ঐ বেদের মেয়ে। সাঁপ কেচ্ছা ধরে যে।’
-‘আম্মাজান, সে আমার স্ত্রী।’
-‘রাখো তোমার এসব কথা। আমি মানি না এই বিয়ে।’
-‘আমার আর তাঁর সন্তান এই পৃথিবীতে আসতে চলেছে।’
-‘না। আমি সেই সন্তানকে মানি না। আমার বংশের কেউ নয় সে।’
-‘সে আপনার আর আমার রক্ত আম্মাজান। আপনি তা অস্বীকার করতে পারেন না।’
-‘পারি। আলবৎ পারি। তুমি ঐ মেয়েকে তালাক দাও।’
-‘সম্ভব না।’
-‘ভেবে বলছ তো?’
-‘হ্যাঁ। বিনিময়ে সব ছাড়ব তবে তাকে নয়।’
-‘আমাকেও ছাড়তে পারবে!’
-‘জানিনা। তবে আমি চাই না এমন পরিস্থিতি তৈরি হোক যখন আমার কাউকে বেছে নিতে হবে।’
-‘যদি হয়!’
-‘আমি সিন্ধুকে ভালোবাসি আম্মাজান। তাঁকে ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
-‘তবে বলছ আমাকে ছাড়বে! আর বেগম আর তোমার পুত্র? তাদের?’
-‘আমি কাউকেই ছাড়তে চাইছিনা। আপনি বোঝার চেষ্টা করুন।’
-‘কিছুই বোঝার নেই। যা বোঝার বুঝে গেছি।’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাহনেওয়াজ। তখনিই জবেদা আসে হাতে দুধের পেয়ালা। মাশহুদা বললেন,
-‘গরম গরম দুধ খাও। শরীরে তো দেখছি পুষ্টি নেই। খাওয়া দাওয়া নাকি করছ না! এখন এটা খাও আমার সামনে। আমি একটু দেখি।’

শাহনেওয়াজ খুশি হলো। মা তার উপর বুঝি রেগে থাকবে? কখনোই না। মা তো মা। সে তার সন্তানের সাথে মান অভিমান করে কতক্ষণ থাকবে? যদিও দুধ খেতে ইচ্ছে করছিল না তার তবুও মায়ের মুখের দিকে তাঁকিয়ে দুধ পান করল। মিনিট গড়ানোর ও সময় লাগল না। শাহনেওয়াজ এর ভেতর থেকে আত্মচিৎকার ভেসে এলো। গলা ধরে রাখল। তার যে বুক গলা সব জ্বলে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তেই বেগম সুগন্ধ্যা কক্ষে প্রবেশ করে। দরকারি কাজে এসেছিল মাশহুদা বেগমের কাছে। কিন্তু এসে স্বামীকে এভাবে ছটফট করতে দেখে সে আৎকে ওঠে। দিক দিশা ভুলে গিয়ে শাহনেওয়াজ এর কাছে কোনোরকমে ছুটে গেল। আকড়ে ধরতেই শাহনেওয়াজ এর গোঙানির শব্দ শুনতে পেল। মাশহুদা বেগমের দিকে তাকালে দেখতে পায় তিনি বসে আছেন। নড়ছে না একটুও। তার ছেলে এভাবে কাতরাচ্ছে সে কী দেখছে না!
-‘আম্মাজান! উনি এমন করছেন কেন! আম্মাজান!’
সুগন্ধ্যা হাউমাউ করে কেঁদে দিল। জবেদা কে বলল,
-‘বৈদ্য ডাকুন কবিরাজ ডাকুন। উনি এমন করছেন কেন? ইয়া আল্লাহ্!’

শাহনেওয়াজ এর কথা আসছেনা মুখে তবুও সুগন্ধ্যার হাত ধরে বলল,
-‘আমার সন্তানদের দেখে রেখো বেগম। আমার সিন্ধুকে দেখে রেখো। আমার আম্মাজানকে দেখে রেখো। নিজের খেয়াল রেখো।’
তারপর তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বহু কষ্টে বলল,
-‘আম্মা আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি আপনাকে ক্ষমা করলাম আম্মা। আপনার উপর রাগ নেই।’
-‘এসব কী বলছেন আপনি! আপনার মাথা খারাপ হলো নাকি! এমন কেন করছেন!’
আর জবাব দিতে পারল না শাহনেওয়াজ। তার মুখ ভর্তি ফেনা গড়িয়ে পড়ল। মৃ’ত্যু’র দিকে সে তলিয়ে গেল। সুগন্ধ্যা শূন্য হয়ে গেল। তার বুঝতে বাকি রইল না তার স্বামী কেন এমন করছিল! সে মাশহুদা বেগমের দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকায়। তার চোখে পানি টলমল করছে। তবুও সে শক্ত। সুগন্ধ্যা সবই বুঝে গেল। এই নিষ্ঠুরতা সইতে পারল না। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। হাহাকার করে ওঠে।
-‘আল্লাহ্!’
সে কী আর্তনাদ তার! সারা জমিদার বাড়ি কেঁপে উঠে তার এই গগনবিদারী কান্নায়। সে যখন কান্নায় ব্যস্ত তখন মাশহুদা বেগম উঠে এলেন ধীর পায়ে। শাহনেওয়াজ এর পায়ের কাছে বসে তার সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিল। ডান হাতটা নিয়ে উল্টোপিঠে চুমু খেয়ে বলল-
-‘আমার আব্বা! তুমি কেন আমারে মাফ করলা!’
তিনি এখন বুঝতে পারছেন রাগের বশে তিনি কী করে ফেলেছেন! দিন দুনিয়া ভুলে গেলেন। একবারও ভাবলেন না কাকে তিনি খু’ন করতে যাচ্ছে। এই গুনাহ এর শাস্তি কী!

জবেদা আশেপাশে ছড়িয়ে দিল ইংরেজদের সাথে পরাজয় হওয়ার ভ’য়ে জমিদার আত্মহ’ত্যা করেছেন। প্রত্যয় শাহ্ সেই মুহূর্তে জমিদার বাড়িতেই প্রবেশ করছিল। সব শুনে দৌঁড়ে আসে। শাহনেওয়াজ এর লা’শ দেখে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। কে বলেছে পুরুষ মানুষ কাঁদতে পারেনা? তারা কী দেখেছে, কঠোর হৃদয়ের প্রত্যয় শাহ্ এর সেই কান্না! বন্ধু বিয়োগে কেউ এভাবে কাঁদতে পারে তা প্রত্যয় শাহ্কে দেখেই সবাই জানল। শেখ মৃত্যুঞ্জয় এলেন পরদিন। কবর দেওয়ার আগে তাকে যখন মাটি ছুঁতে দেওয়া হলো সে এক মুঠ মাটি নিজের পকেটে পুরে নেয়। আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। কারণ সুগন্ধ্যার আর্তনাদে চারপাশ কেমন বি’ষি’য়ে উঠছে। সে সইতে পারছে না এসব। তার মন বলছে এটা আত্ম’হ’ত্যা নয়। আসল সত্যি জানার অপেক্ষা শুধু।

সিন্ধু খবর পেয়ে পাগল প্রায় হয়ে গেল। এই কাঁদে, এই শাহনেওয়াজ এর স্মৃতি মনে করে হাসে, এই নিজের ভাগ্যকে দোষারপ করে। সে হাউমাউ করে কাঁদে। একটি বার! কেন একটি বার সে শাহনেওয়াজকে আটকালো না! কেন! আজ যদি সে তাকে নিজের কাছে আটকে রাখত তবে কী এমন কিছু হতো?

ভোর রাতে তার প্রসব বেদনা উঠল। তার কোল আলো করে এলো এক কন্যা সন্তান। কিন্তু সেই সন্তানটির জীবনে আলো নেই। কারণ তার যে বাবা নেই!

জমিদারকে কবরে চির নিদ্রায় শায়িত করার পর বেগম সুগন্ধ্যার কাছে মৃত্যুঞ্জয় আসে। তাকে দেখেই সুগন্ধ্যা বলতে থাকে,
-‘উনি আত্ম’হ’ত্যা করেনি। সব মিথ্যে। আম্মাজান! আম্মাজান খু’ন করেছে। দুধে বি’ষ মিশিয়ে।’
মৃত্যুঞ্জয় নিজেই চমকে গেল। সে ভাবতেও পারেনি যে এই কাজ মাশহুদা বেগম করেছেন!
-‘আমার স্বামী আমাকে তার সন্তানদের দেখে রাখতে বলেছেন। সিন্ধুকে দেখে রাখতে বলেছেন। আমি তার কথা পালন করব। আমাকে বলুন! সিন্ধু কোথায় আছে! আমি তার কাছে যাবো।’
-‘আপনি বের হতে পারবেন না এখন।’
-‘বেশ। আমি আজ না হলেও দুইদিন পর ঠিকই বের হবো। আমার স্বামীর শেষ কথা আমি মেনে চলবই।’
আবারও বিলাপ শুরু হলো। তখনিই সিন্ধুর সন্তানের খবর এলো মৃত্যুঞ্জয় এর কানে। সে ছুটে গেল সেই মহলের দিকে।

তার এখন যে অনেক কাজ বাকি আছে! আগে সিন্ধু এবং তার সন্তানকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে হবে।

৬৯.
সেই রাতে আরেকটি মৃ’ত্যু ঘটে। সন্তান প্রসবের সময় অতিরিক্ত র’ক্ত ক্ষ”রণের জন্য সিন্ধুকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দুনিয়ার উপর ভীষণ অভিমান করে সে চলে গেল। দুধের শিশুটা একা পড়ে রইল। মৃত্যুঞ্জয় গিয়ে বাচ্চাটিকে কোলে নিল। তবে সে মুন্নার থেকে একটি চিঠি পেল। চিঠির সাথে একটা বাক্স। মুন্নার চোখ মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সে খুব কান্না কাটি করেছে। মৃত্যুঞ্জয়ের মুন্নার জন্য মায়া হলো। ছেলেটি শাহনেওয়াজকে যেমন ভালোবাসতো, শ্রদ্ধা করত তেমনি শাহনেওয়াজ তাকে স্নেহ করত, আগলে রাখত। আজ এই ছেলেটা কে দেখবে? সিন্ধুও চলে গেল না ফেরার দেশে। এই ছেলেটি ভীষণ একা!

চিঠির ভাজ খুলতেই সুন্দর হাতের লেখা ভেসে উঠল-

মৃত্যুঞ্জয় মশাই,
আপনাকে আমি বরাবরই ভীষণ রকম শ্রদ্ধা করি। কেন না আপনার মতো খাঁটি হীরে খুব কম হয়। আপনার ব্যবহার আপনার কথা বরাবরই আমাকে মুগ্ধ করেছে। আপনার চেয়ে বিশ্বস্ত আমার আর কেউ রইল না। আমি জানি, আমার স্বামী আত্ম’হ’ত্যা করেনি। এই বিশ্বাস আমার আছে। আমি জানিনা কেন যেন আমার মন কু ডাকছে। এমন মনে হচ্ছে বাঁচব না। অবশ্য এই চিঠি আপনি তখনিই পাবেন যখন আমার মৃ’ত্যু ঘটবে। নিশ্চয়ই এতক্ষণে আমি মৃ’ত। মুন্নাকে দেখে রাখবেন। আমার ছোট ভাইয়ের মতো সে। আর আপনার বন্ধুর কী হয় তা তো জানেনই। আমার সন্তান যদি বেঁচে থাকে তবে তাকে দেখে রাখবেন। দয়া করে তার বড় মা অর্থাৎ বেগম সুগন্ধ্যার কাছে বড় আপার কাছে তাকে দিবেন। আমি জানি সে আমার সন্তানকে ফেলে দিবেনা। জমিদার কন্যার পরিচয় না-ই বা পেল। একটা ঘর যেন পায়। আমার বাবা গ্রামে থাকে। তার একটু খোঁজ খবর নিবেন। কিছু পয়সা কড়ি রেখেছি আমার পটলিতে। আমার বাবাকে দিবেন। আর এই যে বাক্স! এটা আপনার বন্ধুর দেওয়া শেষ এবং মহামূল্যবান উপহার। এটা হলো সিন্ধুর নীল। আমার আর তার ভালোবাসার প্রতীক। আপনি এই বস্তুকে একটি সুরক্ষিত জায়গায় রেখে দিবেন। আমার স্বামীর এই ভালোবাসার প্রতীকে যাতে অবমাননা না হয়। লুটে’রাদের হাত থেকে রক্ষা করবেন। তবে আপনার পরবর্তীতে এই সিন্ধুর নীলের জন্য এমন কাউকে বেছে নিবেন সে যেন আমার এই ভালোবাসার প্রতীককে রক্ষা করে। সম্পূর্ণ আপনার উপর এই সিদ্ধান্ত। আমি জানি! আপনি কখনো ভুল করবেন না। অন্তত পক্ষে জ্ঞানত।
সব শেষে বলব এই ছোট বোনটার জন্য দোয়া করবেন। আর আমার স্বামীর হ’ত্যার বিচার করবেন। পা’পীদের চরম শা’স্তি দিবেন। আর একটু চেষ্টা করবেন ভালো থাকার। আমি কিন্তু বুঝে গেছি একটা জিনিস। কী জানেন? আপনার সেই না পাওয়া ভালোবাসা হলো বেগম সুগন্ধ্যা আইনীন। আপা ও ভালো নেই। তার ভালোবাসা হারিয়ে সেও ভালো নেই। তাকে একটু ভালো রাখবার চেষ্টা করবেন। আম্মাজানকেও দেখে রাখবেন।

আপনার বাধ্যগত শরবত বানানো বোন
সিন্ধু।

শেষের এই টুকু পড়ে ফিক করে হেসে দিল মৃত্যুঞ্জয়। ছোট্ট বাচ্চাটাকে মুন্নার থেকে নিয়ে সে বলল প্রত্যয় শাহ্ কে খবর দিতে। সিন্ধুর দাফন এর কাজ শুরু করতে হবে তো।

তারপর শাহনেওয়াজ আর সিন্ধুর ভালো বাসার প্রতীক সিন্ধুর নীল আর তাদের কন্যাকে নিয়ে সে অজানায় পাড়ি দিল। সুগন্ধ্যাকে খবর পাঠায় সে মুন্নার মাধ্যমেই। তাকে বলা হয় সে যেন অতি দ্রুত বাচ্চাটিকে নিয়ে যায় এসে। সুগন্ধ্যা বাহিরে এসে দেখে ঝড় শুরু হয়েছে। এই তান্ডবে মৃত্যুঞ্জয়ের বলিষ্ঠ অভয়ব দেখা যাচ্ছে। সে কাছে যেতেই বাচ্চাটিকে তার হাতে ধরিয়ে দিল সাথেই দিল দুইটি ডায়েরী এবং একটি চিঠি। সেই চিঠিতে লেখা ছিল সিন্ধুর নীলের খবর। মৃত্যুঞ্জয় দূর দূরান্তে ছুটল কেবল এই সিন্ধুর নীল রক্ষা করার জন্য। অবশেষে এমন এক জায়গা পেল। সেই জায়গার কথা সে বৃত্তান্ত লিখে দিল সুগন্ধ্যার কাছে। কেননা সিন্ধু যেমন তাকে বিশ্বাস করে সে ও বিশ্বাস করে সুগন্ধ্যাকে। প্রত্যয় শাহ্ মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছেন। এই মুহূর্তে এই গুরু দায়িত্ব তাকে দেওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া তারা যোদ্ধা। যে কোনো দিন যে কোনো জায়গায় শহীদ হতে পারে। তখন এই অমূল্য রতন কে দেখে রাখবে! এর মধ্যে দামি পাথরের থেকেও দামি হলো ভালোবাসা। এই ভালোবাসার প্রতীক সে নিজের জীবন ভর আগলে রাখবে। তার বন্ধুর শেষ স্মৃতি! তার ছোট বোনের শেষ স্মৃতি!

☆☆☆☆☆☆
পরের পৃষ্ঠা গুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে। এখনও অনেক কিছু জানা বাকি আছে। নিদ্রা হাসফাস করতে থাকে। এ সে কী পড়েছে! এর শেষ না জানলে যে তার কোনো কিছুতে মন বসবে না। সে আরেকটু খুঁটিয়ে বইটি দেখতে থাকে। তখনিই তার চোখ যায় হার্ডকভার এর গায়ে লেখা “মৃত্যুঞ্জয় সরকার” নামটিতে। সে চমকে উঠল। এ কোন মৃত্যুঞ্জয়! আর সরকার! শাহনেওয়াজ সরকার, শেখ মৃত্যুঞ্জয়। সব কেমন তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে নিদ্রার। এই লোক কে? আর এই সব আসলেই কী ঘটেছে! সব তো সত্যিই লাগছে। তবে সেই সিন্ধুর নীল কোথায়? কোথায় রাখা হয়েছিল!
বইটা ব্যাগে পুনরায় রেখে দিয়ে নিদ্রা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ভোর হয়ে আসছে বলা চলে। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে। কপাট গুলো খুলে দিতেই তরতর করে বাতাস ঢুকে তার খোলা চুল এলোমেলো করে দেয়। তখনিই একটা গাড়ি আসে গেইটের সামনে। সে সেদিকে আর তাকায়না। তার যে এখন আর কিছুই ভালো লাগছে না কেমন বুক ধরফর করছে।
ওদিকে গাড়ি থেকে একে একে নির্ঝর, অভ্র, এহসান, নিহারীকা এবং মৃত্যুঞ্জয় নেমে পড়ে। সবাই এই লং জার্নিতে ভীষণ ক্লান্ত। বাস স্ট্যান্ডে আসতেই নির্ঝর তার ছোট মামাকে কল করে। তিনি গাড়ি পাঠিয়ে দেয়। সবাই ভেতরে ঢুকলেও এহসান কেন যেন দাঁড়িয়ে পড়ল। তিন তলা বাড়িটির দোতালার ডান দিকের কোণায় যে রুমটি আছে তার বড় জানালা টা উন্মুক্ত। জানালার সাথে এক রমণী দাঁড়িয়ে আছে ওপাশে ফিরে। এহসানের মনে হলো এ যেন তার বহুদিনের চেনা কেউ! বারবার তার মনে কড়া নাড়ছে একটি নাম ‘প্রথমা নিদ্রা’।

নির্ঝর এহসানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গেল। এখানে দাঁড়িয়ে থাকার মানে কী সে বুঝতে পারলো না!

(প্রথম খন্ডের এই খানেই সমাপ্তি টানলাম। দ্বিতীয় খন্ড কবে শুরু হবে জানিনা। তবে আপনাদের এত অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখীত। আমি আজ রি-চেইক দিতে পারলাম না। বেশ বড় আর হাতেও সময় নেই। আগামীকাল আবার সব ঠিকঠাক করব। আপনারা ভুল গুলো ধরিয়ে দিবেন। আর এই সিন্ধুর নীলের জার্নি কেমন লাগল অবশ্যই জানাবেন।

06/03/2024

পর্ব-৩৭

৬৫.
বিয়ের পর সিন্ধুকে জমিদার তার অন্য একটি বাড়িতে নিয়ে যায়, যা শহরেই অবস্থিত। সিন্ধুর বিয়ের ব্যাপারে সিন্ধুর বাবা ছাড়া আর কোনো আত্মীয়, কাছের মানুষ কেউই জানেনা। যেহেতু জমিদারের জমিদারি কাজ কর্ম আছে তাই তার এই বাড়িতে প্রতিদিন আসা হয়না। তাছাড়া বড় বেগমের ও শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা। সব কিছু বিবেচনা করেই সিন্ধুকে একা ছাড়তে হলো। সিন্ধুও এতে কিছু মনে করল না। তার নিজেকে ভীষণ অপরাধী লাগে ভীষণ!

গ্রাম থেকে মুন্নাকে নিয়ে এসেছে শাহনেওয়াজ। সে সিন্ধুর পরিচিত তাই সিন্ধু তাকে আপদে বিপদে ডাকতে সাহস পাবে তাই। প্রত্যয় শাহ্ শাহনেওয়াজ এর এই গোপন বিয়েতে বেশ রাগ করেছেন। তবে সিন্ধুর সাথে নমনীয় ব্যবহার করেছে। শেখ মৃত্যুঞ্জয়কে দেখে সিন্ধু যা বুঝল, তিনি সারাক্ষণ একটা খাতা নিয়ে ঘুরেন। হুটহাট লেখালেখি করে, চিত্র আঁকে। বেশ ভালো কবিতা আবৃত্তি করে। প্রতিদিন বৈকেলে এসে সে সিন্ধুর হাতে বানানো শরবত খেয়ে যায়। তার নাকি এই শরবতটি ভীষণ প্রিয়! আর কিছু খায়না। শুধু এই শরবত টুকুই খায়। একদিন সিন্ধু জিজ্ঞেস করল,
-‘আপনি কবিতা লিখতে পারেন!’
ওমনি মৃত্যুঞ্জয় হেসে বলল,
-‘আমি তো সব নিজের লেখা কবিতাই আবৃত্তি করি।’
-‘কী বলছেন! এত সুন্দর কবিতা লেখেন আপনি?’
মৃত্যুঞ্জয় মুঁচকি হাসে। সিন্ধু ক্ষানিকটা লজ্জা নিয়ে বলল,
-‘আমাকে একটা কবিতা লিখে দিবেন?’
এবারও ঠোঁটে হাসি বজায় রেখে মৃত্যুঞ্জয় জানতে চাইল,
-‘জমিদারের জন্য বুঝি!’
লজ্জিত নয়ন নিচু করে সম্মতির সুরে মাথা ঝাকায় সিন্ধু। মৃত্যুঞ্জয় বলল,
-‘বেশ! তবে আগামীকাল লিখে আনব। তবে সুর দিয়ে গান বা আবৃত্তি যা-ই করার সেটা আপনি করবেন। ঠিক আছে?’
-‘গানও গাইতে পারব? সেটাও হয়!’
-‘অবশ্যই হয়। আমার কাজ হলো লিখা। এবার সেটা আপনি গলগল করে পড়ে যেতে পারেন কিংবা কবিতা আবৃত্তিও করতে পারেন চাইলে গানও গাইতে পারেন। সবটা আপনার হাতে। তবে এখানে বিশেষ একটি ব্যাপারও আছে। আমি যদি এটার ধরণ কেবলই কবিতার জন্য লিখি তো কেবলই কবিতাই হবে। এর বেশি কিছু করা অসম্ভব ব্যাপার। এখন আপনি বলুন আপনি কোনটা চান?’
-‘তবে আমাকে শুধুই কবিতা দিবেন। আমি গান গাইতে পারিনা।’
-‘জমিদার মশাই কিন্তু দারুন গান গাইতে পারে। প্রত্যয় শাহ্ চমৎকার তবলা বাজায়।’
-‘বাহ! আপনাদের সবারই এত গুণ!’
-‘এত আর কোথায়? তাছাড়া তথাকথিত এই এত গুণ থেকে লাভ হলো কী? যার পাত্তা পাওয়ার কথা ছিল তারই কোনো পাত্তা পেলাম না। যাই হোক! আপনি ইংরেজি পড়েন তো?’
-‘হ্যাঁ পড়ি। মাস্টারমশাই বলে আমার ইংরেজি ভালো হয়।’
-‘তবে আপনাকে একটা উক্তি বলা যায়। বলব?’
-‘বলুন!’

কিছুক্ষণ ভেবে মৃত্যুঞ্জয় বলল,
-‘না থাক! আজ নয়। আমি বরং আপনাকে পরে বলব।’
-‘ভুলে গেছেন?’
-‘ভুলব কেন? আমার প্রিয় উক্তি আমি কখনো ভুলিনা। আসলে সময়টা সঠিক নয়। আমার যখন মনে হবে সময়টা সঠিক তখনিই বলব।’
-‘আপনি সারাক্ষণ কী লেখালেখি করেন দেখি। আসলে কী লেখেন!’
-‘আমি দৈনন্দিন জীবনে ঘটা সবই লিখি আমার ডায়েরীতে। সারাক্ষণ সেটাতে ব্যস্ত থাকি। আমার শখের কাজ বলতে পারেন।’
-‘বিরক্ত হোন না?’
-‘বিরক্ত হবো কেন? আমরা যা ভালোবাসি তা সারা জনম ভরে করে যেতেও বিরক্তি আসবেনা।’
-‘আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন।’
-‘আপনার শোনার কানটা সুন্দর বুঝলেন! তাই আমার কথা সুন্দর লাগে। প্রত্যয় শাহ্ মজা করে বলে আমার এসব কাব্যিক কথা, সাহিত্যিক কথা নাকি সে আ’ফি’মের সাথে গুলে খাইয়ে দিবে ইংরেজদের। তারপর তাদের মুখ থেকেও এসব বের হবে। হুকুম দারি ভুলে তারা এমন ভবঘুরে মশাই হবে আমার মতো।’

সিন্ধু হেসে দিল। সন্ধ্যার আগেই মৃত্যুঞ্জয় বিদায় নিলেন। রাতে সিন্ধুর শরীর খারাপ করলে মুন্না বৈদ্য নিয়ে আসে। তিনি দেখে জানালেন সিন্ধু সন্তানসম্ভবা। বেগম সুগন্ধ্যার কানে যখন কথাটা গেল সে বিছানা আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলেন। ভোরের আলো ফুটবার আগেই সিন্ধুর কাছে হাজির হয় শাহনেওয়াজ। স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরেন পরম আবেশে। এই সুখবর তার সবকিছু কেমন শান্তিতে ভরিয়ে তুলেছে যেন।

দিন পার হয়, সময় যায়, তারই সাথে নতুন কিছু সংযোজন হয় কিছু বিয়োজন। বেগম সুগন্ধ্যার কোল আলো করে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হলো। এদিকে সিন্ধুও পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। জমিদার পড়েছে দ্বিধায়। এখন কোন দিকে যাবে, কার দিকে খেয়াল দিবে! সিন্ধু বলল তার এখন নিজ পুত্রের কাছে থাকা আবশ্যক। সিন্ধুর দেখভাল করার অনেক মানুষ আছে। শাহনেওয়াজ কিছুটা স্বস্তি পেয়ে মূল ভবনে থাকা শুরু করল। দিন গেল মাস গেল তার হদিশ মিলে না সহজে। দু এক বার এসে আর আসেনা আবার আসলে দু ঘন্টার বেশি থাকেনা। এদিকে সিন্ধুর গর্ভাবস্থার আটমাস চলছে। রোজ রোজ মৃত্যুঞ্জয় ঠিকই আসে কথা বলে তবে সিন্ধুর মন পড়ে থাকে কেবল জমিদারের দিকে। সে মন প্রাণ দিয়ে চাইতে থাকে জমিদার যেন মৃত্যুঞ্জয়ের মতো রোজ রোজ তার এই বাড়িতে আসে। মৃত্যুঞ্জয় বলেছিল কবিতা লিখে দিবে। দিয়েওছে, কিন্তু কবিতা শোনানোর মানুষটি নেই বলে সেই কাগজটি আলমারির ভেতর সিন্ধুর লাল রঙা শাড়ির ভাজে পড়ে আছে।

এদিকে খবর এসেছে ইংরেজ নাকি জমিদারের উপরে চটেছে। তারা নাকি কিছুতেই জমিদারের ক্ষ’ম’তা টি’ক’তে দিবেনা। কারণ জমিদার এখনও আফিম চাষের অনুমতি দেয়নি। এবং সে কোনো ইংরেজকে তার সীমানায় না আসার জন্য কঠোর ভাবে মানা করেছে। রাজা মশাইও এখন দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে। সে নাকি শাহনেওয়াজকে বলেছেন ইংরেজদের সাথে শুধু শুধু লেগে লাভ নেই। তার থেকে ভালো ক’বিঘা জমিই তো! ছেড়ে দিলে আর কী ক্ষতি হবে! শাহনেওয়াজেরও কথা এসব হা’রা’মখোরের হা’রা’ম চাষাবাদ সে তার দেশের মাটিতে করতেই দিবেনা। ব্যাস! দুজনের একটা অদৃশ্য দ্বন্দ শুরু হলো। এই সব সিন্ধু প্রত্যয় শাহ্ এর কাছে থেকে জেনেছে। কেননা মৃত্যুঞ্জয় কখনো বাহিরের কথা এসে বলেন না। কোলাহল এড়িয়ে চলা মানুষ তাই সে চুপচাপ থাকে এসব ব্যাপারে। তবে তাকে জড়িয়ে ফেলে যদি সেদিনই হবে আসল সর্বনা’শ। তার ভেতরের লুকায়িত সেই ভয়ঙ্কর, হিংস্র সত্তা দেখেনি এমন প্রতিপক্ষ তার বিরল। সে শান্ত তো সব শান্ত! তাই অনেকে তার থেকে অনেক কিছু লুকিয়ে ফেলে। বদরাগী না হলেও সে ভীষণ রাগী। বদ’টা বাদ কেবল।

এসবের চিন্তায় সিন্ধুর শরীর খা’রা’প করল। মুন্নাকে শত বারণ করার পরেও সে শাহনেওয়াজ এর কাছে বার্তা পাঠায়। সেই দিনই ছুটে আসে শাহনেওয়াজ। নিজের এমন ভুলের জন্য শতবার মাফ চায়। সিন্ধুর একটাই কথা! সে কী তার মাফ চেয়েছে?

৬৬.
রাতের পরিবেশ খুব ঠান্ডা থাকে। চারিদিকে বিরাজ করে শুনশান নিরবতা। সিন্ধু দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার রেলিং ধরে। সে নিজের জীবনের চক্র নিয়ে ভাবছে। এত কিছুর মধ্যে তার খেয়াল হলো না কখন শাহনেওয়াজ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যখন শাহনেয়াজ তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তখন সে হুশে আসে। বলে,
-‘আজকে ফিরবেন না?’
-‘উহু। আজকে থাকব।’
-‘শুধু আজকেই?’
-‘তুমি বলো তো! কতদিন থাকা যায়!’
-‘আপনি বলতে পারবেন না?’
-‘না।’
-‘তাহলে তো আমি জানিনা কতদিন থাকা যায়। তবে ভালো হয় আপনি ফিরে গেলে। শুনেছি আম্মাজান এখনও রেগে আছেন আপনার উপর। এই সময় আর তার বদ দোয়া নিতে চাইনা। এতে আমার বাচ্চাটার যদি কোন ক্ষ’তি হয়? দরকার নেই। আমি কারো মনে কষ্ট দিতে চাইনা ফিরে যান আপনি।’
-‘আমি যে তোমার আর আমার অনাগত সন্তানের মনে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি! তার বেলায়?’
-‘সে আপনি জমিদার মানুষ। দিতেই পারেন। আপনার আবার অ’প’রা’ধ হয় নাকি?’
-‘আমি কী রক্তে মাংসে গড়া মানুষ নই?’
-‘আমি সেটা বলছিনা। আপনি এখন আসুন। অনেক রাত হলো। আর কত?’
-‘কীসের আর কত! তুমি বোঝো না! এই, তুমি সত্যিই বোঝোনা?’
-‘কী বুঝব?’ আহ! কেমন অভিমানি গলা। শাহনেওয়াজ একটু তেজ কমায়। বলে,
-‘আমি তোমাকে ভালোবাসি যে বেগম!’
-‘কেন বাসলেন?’
-‘জানিনা।’
-‘আগে জেনে আসুন। তারপর ভেবে দেখল আপনার ভালোবাসা বোঝার দরকার আছে কী নেই।’
-‘এত পা’ষা’ণ কেন তুমি?’
-‘হতে হয়। সেটা আপনি বুঝবেন না।’

সিন্ধু চলে আসতে নিলেই শাহনেওয়াজ তার হাত ধরে আটকায়। ছোট্ট টুলের উপর যে একটা বাক্স ছিল সেটা এতক্ষণে সিন্ধুর নজরে এলো, যখন শাহনেওয়াজ সেটা হাতে নিল। সিন্ধু ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই শাহনেওয়াজ বাক্স থেকে একটা আয়না বের করে। যে সে আয়না নয়! এ যে বিশ্বের নামি দামি কিছু রত্নদের মধ্যে সজ্জিত। গাঢ় নীল রঙের পাথর চিকচিক করছে, সাদা হীরের ঝলক দেখা যাচ্ছে। সিন্ধুর পেছনে দাঁড়িয়ে শাহনেওয়াজ দুই হাত দিয়ে আগলে ধরে আয়নাটা সিন্ধুর মুখের সামনে ধরে বলল,
-‘তোমার জন্য এই সিন্ধুর নীল।’
বিমোহিত নয়নে চেয়ে সিন্ধু বলল,
-‘মানে!’
-‘তোমার ঐ চোখটা নীল সমুদ্র আমার কাছে। এত গভীর যে আমি সেই গহ্বরে তলিয়ে যাই যাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়াই হয়না। এতটাই গভীর! ঐ দৃষ্টি আমার বুক কাঁপায়। সিন্ধু অর্থ সমুদ্র আর সেই সমুদ্রের নীল স্বচ্ছ পানি গুলো আমার ভীষণ প্রিয়। তাই আমি চাই সেই সিন্ধুর নীল যেন এই সিন্ধুটাও গভীর ভাবে দেখতে পারে, মন ভরে দেখতে পারে, তাই এই আয়না এনে দিলাম। এই আয়নার নামই আমি দিলাম সিন্ধুর নীল। দ্যাখো! খোদাই করা আছে পাথরে।’
সিন্ধু তাঁকিয়ে দেখে সত্যিই! খুশির চোটে সে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছে।
-‘এই রত্নের কথা আমি শুনেছিলাম। এগুলো খুবই দামি। আপনি একটা সামান্য আয়না এনেছেন তাতে এই এত দামি পাথর কেন দিলেন!’
-‘আমি যখন নবাবের মহলে গিয়েছিলাম তখন নবাবের নাতি শেখ মৃত্যুঞ্জয়কে একটা ত’র’বা’রি প্রতিযোগিতায় হারিয়েছিলাম। নবাব আমার এই দূরদর্শিতা দেখে খুশি হয়ে এই রত্ন গলো দিয়েছিল। আমি নিতে যখন অস্বীকৃতি জানাই তখন তিনি বলেন এই রত্ন আমার নয়। আমি যখন আমার জীবনে এই রত্নের থেকেও বড় কোনো রত্ন পাবো তখন যেন তাকে এগুলো উপহার হিসেবে দেই। কারণ সেদিন আমি না বুঝলেও আজ বুঝতে পারছি ভালোবাসার থেকে বড় রত্ন আর হয়না। সেদিন নবাব এটাই বোঝাতে চেয়েছিল। আর তুমি আমার সেই ভালোবাসা যা আমার সবচেয়ে দামি বস্তু। এই আয়না কখনো সামান্য যেন না হয় তাই বিশেষ ভাবে তৈরি করলাম। যাতে লাখো সহস্র আয়নার মধ্যেও সিন্ধুর নীল থাকে সর্বদা প্রজ্জ্বলিত। এই সিন্ধুর নীল আমার ভালোবাসা, এই সিন্ধুর নীল আমার ভালোবাসার প্রতীক। ‘

ক্রন্দনরত সিন্ধু শাহনেওয়াজের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে কী কান্নাটাই না করেছে সেদিন!
ভালোবাসা ময় দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিল। সমস্যা আসে তখন, যখন শাহনেওয়াজ এর আম্মাজান সিন্ধুকে তা’লা’ক দেওয়ার হুকুম প্রদান করল। শাহনেওয়াজ এক বাক্যে অসম্মতি জানালে তিনি যেন আরো ক্ষে’পে যান। তার এই রকম মা’ন’সি’ক অবস্থায় কু মন্ত্রণা দেয় এক দল লোক! ইংরেজ পর্যন্ত খবর চলে যায় শাহনেওয়াজ এর দুর্বিষহ জীবনের ভেতরকার কথা। তারা গোপনে দেখা করার আমন্ত্রণ দেয় শাহনেওয়াজ এর মা মাশহুদা বেগমকে। তিনিও বোধ বুদ্ধি হারিয়ে তাদের আমন্ত্রণ গ্রহন করে সবার অলক্ষ্যে। তারপরই জমিদার বাড়িতে নেমে আসে ঘন, কালো, অন্ধকার এবং চরম বি’ভ’ৎস অধ্যায়। যা কখনো হওয়ার ছিল না!

#চলবে

03/03/2024

সিন্ধুর_নীল (পর্ব-২৯)
লেখক– ইনশিয়াহ্ ইসলাম।

৪৯.
ঠক ঠক শব্দ শুনে নিদ্রার মাত্র চোখে লেগে আসা ঘুমটা ভঙ্গ হলো। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলতেই এহসানকে দেখা গেল। এহসানের পেছনেই আছে একজন হোটেল সার্ভিস বয়। নিদ্রা সরে দাঁড়ালো দরজা থেকে। কক্ষে প্রবেশ করল এহসান এবং তার পরই সার্ভিস বয়টি। সে খাবার পরিপাটি করে রেখেই চলে গেল। দরজা টা পুনরায় লক করে নিদ্রা এহসানের দিকে তাঁকালো। বেশ গম্ভীর তার চোখ মুখের অবস্থা। কিছু হলো নাকি? নিদ্রা একটু এগিয়ে এলো বিছানার কাছে। কারণ এহসান বিছানায় বসে আছে আর খুব মনোযোগ সহকারে মোবাইলে কী দেখছে। নিদ্রার এবার রাগ হলো। সেই কখন বেরিয়েছিল লোকটা ফেরার নাম গন্ধই ছিল না কোনো। এখন রাতে নয়টা বাজে। এতক্ষণ সে তাকে এভাবে একা ফেলে কই কই ঘুরছিল? নিদ্রা বেশ গম্ভীর হয়েই বলল,
-‘কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?’
এহসানের কোনো জবাব নেই। সে এখনও ব্যস্ত আছে ফোনের ভেতর। এবার তাই নিদ্রা বেশ চেঁচিয়ে উঠল,
-‘কোথায় ছিলেন আপনি! আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি আমি উত্তর দিচ্ছেন না কেন?’

এহসান ক্ষাণিকটা ভড়কে গেল। তারপর মৃদু হেসে বলল,
-‘ভার্সিটির কয়েকটা ফ্রেন্ডস্ এর সাথে দেখা হয়েছিল। অবশ্য, ওদের নিজস্ব বাড়ি এখানে নয় তবে চাকরী সূত্রে এখানে আছে। তো সবার সাথে আড্ডা দিতে দিতে রাত হয়ে গেল খুব।’
-‘এতক্ষণ কীসের আড্ডা? আমি একা এইখানে আর আপনি বাহিরে আড্ডা দিচ্ছেন?’
-‘না আসলে তা নয়। বাড়িতে তো কোনো কোনো রাত ফেরাই হয় না। আজ তো জলদিই আসলাম। ওরা তো আসতে দিচ্ছিল না। জোর করছিল খুব তাদের বাসায় যাওয়ার জন্য। আমি তোমার কথা বলেই চলে আসলাম। তবে খুব করে বলছিল তোমায় নিয়ে যেতে একদিন। সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিতে।’
-‘আমি কারো সাথে আলাপ করতে ইন্টারেস্টেড নই।’
-‘জানি।’
-‘কী জানেন?’
-‘এই যে তুমি ইন্ট্রোভার্ট।’
-‘আমি ইন্ট্রোভার্ট! কী বলতে চাইছেন কী আপনি! কোন এঙ্গেল থেকে আমাকে এমন মনে হয়? আমি অসামাজিক জীব!’
-‘দেখো আমি তোমাকে অসামাজিক জীব বলিনি। তুমি নিজেই বলেছ। তবে মন্দও বলনি। ভালোই বলেছ।’
নিদ্রা চরম রেগে গেল। তারপর খেয়াল করল এহসান তার সাথে কথা বললেও তার একটা ধ্যান কেবল তার মোবাইলেই। ব্যাপারটা অদ্ভুর ঠেকল তার কাছে। সে বলল,
-‘আপনি আমার সাথে কথা বলছেন সেটা আমার মুখের দিকে না তাঁকিয়ে মোবাইলের দিকে তাঁকিয়ে বলছেন কেন? মোবাইলটা আমি নাকি!’
এহসান এবার সরাসরি নিদ্রার দিকে তাঁকায়। হালকা হেসে বলে,
-‘সে তো মোবাইলে তুমি আছোই। তবে এখন আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি।’

নিদ্রার আচানক মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে বলল,
-‘কীসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ?’
-‘যে বন্ধুদের সাথে দেখা করেছি তাদের মধ্যে একজনের একটা বাড়ির ডিজাইন নিয়ে সমস্যা। সেইটাই ঠিক করার জন্য অনুরোধ করল খুব করে। ক্লায়েন্ট নাকি প্রেশার ক্রিয়েট করছে আর বেচারাও কাজটা একা হাতে সামলাতে পারছেনা। সো হি নিডস্ মাই হেল্প। এন্ড এজ এ ফ্রেন্ড আই আম হেল্পিং হিম এজ মাচ্ আই ক্যান।’
-‘ওকে। করুন হেল্প।’
-‘আপাতত ছবিগুলো দেখে নিলাম বাকিটা ঢাকা গিয়েও করতে পারব। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি নামাযটা পড়ে খাবার খেয়ে নিব। ঠিক আছে?’
-‘আচ্ছা।’
-‘তুমি পড়েছ?’
-‘হুম।’

এহসান নামায পড়ে নিলে দুজনে একসাথে ডিনার করে। রুম সার্ভিসকে কল দিলে তারা এঁটো প্লেট নিয়ে যায়। নিদ্রা ঘুমানোর সময় বলল,
-‘আপনি রাজশাহী এসেছেন কেন?’
-‘আমার দরকার ছিল তাই।’
-‘দরকারটা কী?’
-‘তুমি বুঝবেনা। ঘুমাও।’
-‘আপনি আমাকে মিস করছিলেন খুব?’
-‘হয়তো।’
-‘আপনি খুব বদলে গেছেন। আগে তো এমন ছিলেন না।’
-‘কেমন ছিলাম আগে?’
-‘আগ বাড়িয়ে কথা বলতেন আমার সাথে। আমি বিরক্ত হলেও বারণ শুনতেন না।’
-‘কখনো কখনো ইগনোর করাটা যে খুবই কাজে দেয় ব্যাপারটা সত্যিই বুঝতে পারলাম।’
-‘ইগনোর করছেন আমায়?’
-‘আসলে সেইরকম কিছু নয়। ঢাকা থেকে আসার আগেই তোমাকে বলেছিলাম তোমার অনুমতি ব্যতীত আমাদের মধ্যে আর কিছু হবে না।’
-‘তাই বলে কথাও বলবেন না?’
-‘কথা বলছি তো।’
-‘একদমই বলছেন না। আমিই আগ বাড়িয়ে বলছি। আপনি পাত্তাই দিচ্ছেন না।’
-‘এবার বুঝতে পেরেছ তো যখন আমি কল দিলে এভোয়েড করতে তখন আমার কেমন লাগত?’
-‘আপনি প্রতিশোধ নিচ্ছেন?’
-‘বলতে পারো সেটাই।’

নিদ্রার গলা ধরে এলো। ছোট ছোট কুশন দিয়ে এহসানকে মারতে থাকে। এহসান কিছু বলেনা। হাসতে হাসতে নিদ্রাকে একটানে নিজের বুকে ফেলে। আর জড়িয়ে রাখে পরম আদরে। এদিকে অতি রাগ আর ক্ষোভে নিদ্রার কান্না এসে যায় সে রীতিমত ফোঁপাতে থাকে। আজ তার কী হলো? এহসান এত টা প্রভাব ফেলছে কীভাবে আজ তার উপর?

৫০.
অভ্র এখন দাঁড়িয়ে আছে নির্ঝরের আপার্টম্যান্টের নিচে। গেইটে এন্ট্রি ফর্ম সাইন করে উপরে যখন উঠতে নেয় তখনিই একটা পরিচিত মুখ দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। মুখটা পরিচিত ঠেকলেও নামটা মনে পড়ছিল না। সে এগিয়ে যায় এবং ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলে,
-‘আপনি?’

মৃত্যুঞ্জয় অভ্রকে এখানে দেখে একদমই অবাক হলো না। বরং সে এটাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিল। হেসে বলল,
-‘আরে ডক্টর অভ্র যে! কী খবর?’
-‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি নিহারীকার ফ্রেন্ড না? নামটা আসলে ঠিক মনে করতে পারছিনা।’
-‘হুম নিহারীকার বন্ধু আমি। আমার নাম মৃত্যুঞ্জয় সরকার।’
-‘ওহ। আই আম এক্সট্রিমলি স্যরি নামটা আসলে আমার মাথা থেকেই বের হয়ে গেছিল।’
-‘কোনো ব্যাপার নয়। এখানে কি আপনার বাসা?’
-‘না। নির্ঝরের ফ্ল্যাট এখানেই। চলুন না। চা কফি খাওয়া হবে। ডিনারটাও না হয় করলেন। তিনজন বেশ ভালোই মজ মাস্তি করব।’
-‘আসলে সময় যদি থাকত আমি অবশ্যই এই সুযোগ মিস করতাম না। কিন্তু আমার খুব তাড়া আছে। আমাকে নিজের কর্মস্থলে যেতে হবে আর্জেন্ট।’
-‘ওহ। এইখানে আপনি..’
-‘আমার রিলেটিভস্ এর বাসা। দরকারি কাজে আসতে হলো। আচ্ছা ডক্টর অন্য কোনো দিন না হয় বসে গল্প করা যাবে। আজ আসছি।’
-‘হ্যাঁ। আসুন। ভালো থাকবেন।’
-‘আপনিও।’

মৃত্যুঞ্জয় চলে গেলে অভ্রও নির্ঝরের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এদিকে এত বড় বড় ফ্যামিলি বাসাগুলোর মধ্যে নির্ঝরের একা থাকাটা তার কাছে কেমন যেন লাগে। চাইলে ছোট বাসাও নিতে পারত কিন্তু ছোট বাসায় নবাবজাদা থাকতে পারবেন না। তার ছোট বাসায় দম বন্ধ লাগে। অভ্র বর্তমানে স্বচ্ছল হলেও একসময় তার বড্ড অস্বচ্ছলতায় কাটে। বই কেনার টাকাও খুব কষ্টে যোগাড় করত। এই দুইটা বন্ধুই তো কত বিপদে আপদে সাহায্য করেছে। আর্থিকভাবেও এবং মানসিক ভাবেও। অভ্রর বাবার বংশ নিচু শ্রেণীর নয়, তবে তার বাবা তার চাচাদের মত কম পড়ালেখা করে বিদেশ গিয়ে অঢেল পয়সা কামাতে পারেনি। পেশায় তিনি একজন হাই স্কুল শিক্ষক। তিনি ভাইদের ভালো ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে নিজের জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট করেছেন। অবশ্য নষ্ট বলা চলে না। তিনি কখনোই দায়িত্ব এড়িয়ে চলেনি। বাবার এই জিনিসটাই অভ্র বেশি ভালোবাসে এবং অনেক মান্য করে। যদি চাচারা অন্তত তার বাবাকে একটু দেখে রাখত তবুও নিজের মনকে সে বুঝ দিতে পারত। তবে চাচারা বিয়ে শাদি করে অতি দ্রুতই নিজেদের সফলতার পেছনের বড় ভাইকে ভুলে গেছেন। অবশ্য অভ্রর বাবা কোনোদিন নিজের এইসব শ্রমের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেন নি। অভ্রর ফুপিই তাকে সব জানিয়েছেন। এমনকি বেঁচে থাকা কালীন অভ্রর দাদিও কষ্ট পেয়েছেন ছোট ছেলেদের বড় ছেলের প্রতি করা অন্যায় দেখে। দিন রাত কাঁদত আর তাদের হেদায়াতের কথা বলত। অভ্র ভেবে হেসে দেয়। দাদি তার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। শুধু প্রিয় যে তাও না। একদম খুব কাছের মানুষ যার সাথে সুখ দুঃখের গল্প করলে বুকের ভার কমত। দাদি নেই আজ ছয় বছর হতে চলল। দাদি চাইত অভ্র একদিন খুব কামাই করুক।আজ সে তা করছেও তবে তা চোখ জুড়িয়ে দেখার জন্য দাদি নেই। দাদা দাদিরা সারা জীবন সফল হওয়ার জন্য দোয়া করে আর যখনই সফলতা এসে যায় তখন তা দেখে যেতে পারেন না। অভ্রও হয়তো পারবেনা। হঠাৎ করেই এটা ভেবে সে হাসে। একদিন সেও দাদা হবে। কী অদ্ভুত ব্যাপার!

লিভিংরুমে গল্প গুজবে ব্যস্ত অভ্র আর নির্ঝর। তখন কলিং বেল বেজে ওঠে। বুয়া এসেছিল রাতের রান্না করে দিতে তো রান্না করার আগে সে একটু চা নাস্তা বানিয়ে দিয়েছিল অভ্র আর নির্ঝরকে। এখন ঘরটা একটু সাফ সাফাই করছিল। কলিং বেলের শব্দ শুনে সে নিজেই দরজা খুলে। কিছুক্ষণ পরে ভেতরে হাতে একটা ট্রে নিয়ে ঢুকে পড়ে। নির্ঝর বলল,
-‘কে এসেছে বুয়া?’
-‘পাশের বাসার মালিকে।’
-‘পাশের বাসা বলতে? ওহ যেইটাতে নতুন মানুষ উঠেছেন!’
-‘জ্বে। খানা দিয়া গেছে। তয় রাতে খাবারই। মুরগার রোস্ট, গরুর ভুনা আর পোলাও। আমিও ভাত রাঁধছি। মনে তো হয় না এখন আর কিছু রাঁধা লাগব!’
-‘স্ট্রেঞ্জ! আমাদের হঠাৎ এসব খাবার পাঠালো কেন?’
-‘ওত কিছু বলেনাই। বলছে যে নতুন আইছে তো এর লাগি এই ফোলোরের সক্কলের বাসা বাসায় খানা দিসে।’
অভ্র হেসে দিল বুয়ার মুখে ‘ফোলোর’ শুনে। নির্ঝরের মতো ছেলে প্রতিদিন বুয়ার এসব কথা শুনে! তার তো শুদ্ধ বাসা ছাড়া কথা বলা মানুষ পছন্দ না। আর সেখানে বুয়ার ভাষা তো একেবারে হ জ ব র ল।

-‘আচ্ছা রাখেন। তাহলে আপনি চলে যান। আর খাবার তো বেশিই আছে। কিছুটা নিয়ে যান আপনি। নাহলে নষ্ট হবে। এত খাবার দিল মনে হয় আয়োজন করে কেবল আমাদের জন্যই রান্না করছে। হা হা।’

নির্ঝরের কথা মত বুয়া কিছুটা নিল। আর বাকিটা টেবিলে সাজিয়ে দিল। খেতে বসে নির্ঝর আর অভ্র একদম ঘাপুস ঘুপুস খেল। নির্ঝরের শান্তিটা বেশি লাগছিল। কেন না অনেকদিন পর সে একটু ঘরোয়া ভালো খাবার খাচ্ছে। মা বলেছিল বাড়ি যেতে কাজের চাপে এই কয়দিন যাওয়া হয়নি। তাই খাওয়া দাওয়াও কোনো রকমে কেটেছে।

৫১.
বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। নিদ্রার পরীক্ষাও চলছে। একদিন বান্ধবীরা মিলে ঠিক করল পরীক্ষা শেষে খাবারের হোটেলে যাবে। ভাত, ডাল আর ভর্তা খাবে। সেই অনুযায়ী হোটেলে গেল। খাবার এসে গেল সবাই খাচ্ছে হঠাৎ করেই টিভিতে ব্রেকিং নিউজ আসে। কিছুদিন আগে রাজশাহীর নাম করা পাঁচ তারকা হোটেলে একটি ম’র’দে’হ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে আজ থেকে সাত আটদিন আগের ঘটনা এটি। হোটেলের নাম আর সব বিবরণ শুনে নিদ্রার গা কাটা দিয়ে উঠল। যেই তারিখ ধারণা করা হচ্ছে সেই তারিখে নিদ্রা আর এহসানও সেখানেই উপস্থিত ছিল। ক্ষাণিক বাদেই একটা সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হলো। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে খু’ন হওয়া মেয়েটি দৌঁড়ে একটি রুমে ঢুকে গেল তার পেছন পেছন একটি লোক। লোকটিকে দেখেই নিদ্রার চোখ মুখ উল্টে যাওয়ার মত। বিড়বিড়িয়ে বলল,
-‘এহসান!’

তবে পু’লিশ ধারণা করছেন পুরুষ এর ছদ্মবেশে খু’নি ছিল মূলত মহিলা। কারণ জুম করে তারা দেখতে পাচ্ছিল স্পষ্ট তার হাত, চুল, চোখ মুখের একাংশ। বড় কথা জুতোটি ছিল লেডিস সুজ্। তবে এই একাংশ দেখেও ঠিক ঠাওর করতে পারল আসল চেহারাটি। অনিন্দিতা বলল,
-‘এই তোরা না ঐ হোটেলে উঠেছিলি? কী সাংঘাতিক কান্ড। যদি তোদের কোনো ক্ষতি হয়ে যেত! আল্লাহ বাঁচাইছে।’

নিদ্রার মাথা ভনভন করছে। বারবার এহসান নামটি এসে মাথায় বাড়ি খাচ্ছে। এমনটা এর আগে শপিংমলেও হয়েছিল। সে যেখানেই যায় সেইখানেই এমন কাহিনি ঘটে যায় পরমুহূর্তেই। কেমন যেন ব্যাপারটা।

#চলবে।

Address

Cumilla
918273

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Nusrat Jahan Nipa posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The University

Send a message to Nusrat Jahan Nipa:

Share