23/04/2025
পরবাসের প্রহেলিকা
ফাহিমের জীবনে 'বিদেশ' মানে ছিলো শুধু একটাই শব্দ—স্বপ্ন। বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে সে একদিন পৌঁছায় ইউরোপের এক ছোট শহরে, স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে। ব্যাগভর্তি বই, মনের কোণে কিছু অভিমান, আর চোখজুড়ে একরাশ আশার আলো। নতুন শহর, নতুন নিয়ম, আর নতুন একটা জীবন—সব কিছুই ফাহিমকে প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে দিচ্ছিল।
এই ব্যস্ততার মধ্যেই এক সন্ধ্যায় ফেসবুকে পরিচয় হয় মীমের সাথে। মেয়ে তখন ঢাকায়, এক প্রাইভেট কোম্পানির মিড-লেভেল পদে কাজ করে। কিন্তু তার স্বপ্নও ছিল ফাহিমের মতো—দেশের সীমানা পেরিয়ে একদিন বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে বসা। পরিচয়ের পর থেকেই মীম ও ফাহিমের মধ্যে দ্রুত গড়ে ওঠে এক অদ্ভুত বন্ধন। শুরুতে ছিলো সাধারণ আলাপচারিতা—জীবন, পছন্দ-অপছন্দ, কাজ-কর্ম, আর আবহাওয়ার গল্প। কিন্তু ধীরে ধীরে কথাগুলো গাঢ় হতে থাকে, কণ্ঠস্বরের উষ্ণতা বাড়ে।
মীম ফাহিমকে বলে—“তুই জানিস, আমি সব ছেড়ে একদিন তোর মতো বিদেশে পড়তে যাবো।”
ফাহিম মুচকি হেসে উত্তর দেয়—“তাহলে তুই পড়িস, আমি আছি পাশে। আমরা একসাথেই থাকবো একদিন।”
সেই ‘পাশে থাকা’র প্রতিশ্রুতি যেন ফাহিম মনেপ্রাণে ধারণ করে নেয়। এরপর শুরু হয় এক লম্বা প্রক্রিয়া—ইউনিভার্সিটি বেছে দেওয়া, SOP লিখে দেওয়া, এক্সেল শিটে করে ডেডলাইন ট্র্যাক করা, IELTS এর প্রস্তুতি থেকে শুরু করে ভিসা ইন্টারভিউ পর্যন্ত। এমনকি ভিসা অফিসে যাওয়ার আগের রাতেও ফাহিম তার ভার্সিটির লাইব্রেরিতে বসে মীমকে রিহার্সাল করায়—কীভাবে চোখে চোখ রেখে অফিসারকে বলতে হবে, “I want to pursue my dreams.”
সবই ঠিকঠাক এগোয়। মীমের ভিসা হয়। এক বিকেলে ফাহিম তার ইনবক্সে একটা ছবি পায়—মীমের স্যুটকেস আর টিকিটের বোর্ডিং পাস। ক্যাপশনে লেখা—“আমি আসছি, ফাহিম!”
সেইদিনটা ছিলো ফাহিমের জন্য এক বিজয়ের দিন, যেন তার নিজের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
কিন্তু তারপর... গল্পটা বদলে যেতে শুরু করে।
প্রথম সপ্তাহে কয়েকবার দেখা হয়। মীম যেন চমকে ওঠে শহরের সৌন্দর্যে, ক্লাসের মানে, নতুন বন্ধুর হাসিতে। দ্বিতীয় সপ্তাহে ফাহিম টেক্সট করে—রিপ্লাই আসে দেরিতে। ফোনে কথা বলতে চায় না। তৃতীয় সপ্তাহে দেখা করার কথা বললে বলে—“আজকে ব্যস্ত আছি, অন্যদিন হবে।”
এরপর একদিন মীম বলে ফেলে, এক নিঃসঙ্গ বিকেলে—
“ফাহিম, তুই দারুণ একজন মানুষ। কিন্তু আমি এখন বুঝতে পারি—তোর সঙ্গে আমার ভবিষ্যৎ নেই। আমি মনে করি, আমি একটু ভিন্ন কাউকে ডিজার্ভ করি।”
শব্দগুলো যেন একেকটা করাত হয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয় ফাহিমের সমস্ত অনুভব।
ফাহিম কিছু বলে না। কেবল ফেসবুক মেসেঞ্জারের সেই নীল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেখানে ‘Seen’ লেখা নেই, শুধু লেখা আছে—“Active now.”
---
বছর খানেক পেরিয়ে গেছে। ফাহিম এখনো সেই শহরেই আছে, আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত, অনেক বেশি ব্যস্ত। নতুন বন্ধু, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, আর একরাশ একাকিত্ব তাকে গড়ে তুলেছে অন্যভাবে।
কখনো মীমের কথা মনে পড়ে, চোখ ভিজে আসে। কিন্তু সে এখন জানে—ভালোবাসা মানেই মিলন নয়। কারো জীবনে নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকা, সেটাও একটা রকম ভালোবাসা। আর মানুষকে তার নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাও ভালোবাসারই এক রূপ।
ফাহিম তার জীবনের গল্পে মীমকে দোষ দেয় না। সে কেবল নিজের গল্পটা নতুন করে লিখে যায়—এই পরবাসে, এই প্রহেলিকায়।
©আবু