29/10/2018
নতুন উদ্যোমে এগিয়ে চলছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সংকট ও সমস্যা জর্জরিত ছিল রংপুর অঞ্চলের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক নিয়োগ, উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের অনাস্থা, ক্লাস বর্জন, উপাচার্যের ভবন ঘেরাওসহ নানা আন্দোলনের কারণে গণমাধ্যমে বারবার শিরোনাম হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। তবে নতুন উপাচার্যের নেতৃত্বে নতুন উদ্যমে সেশনজট কাটিয়ে, গবেষণা ও নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
জানা যায়, গত দশক পর্যন্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে রংপুর অঞ্চলের পরিচয় তুলে ধরতে গেলে সবার আগে বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ও কারমাইকেল কলেজের নাম চলে আসতো। বেগম রোকেয়া শুধু রংপুর অঞ্চলেরই নয়, পুরো বাংলাদেশের অহংকার। তার নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ছিলো ওই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের।
২০০৮ সালে অবশেষে রংপুর নগরীর পাশেই কারমাইকেলের বিশাল এক জায়গা জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ওই অঞ্চলের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। রংপুর নগরীর প্রবেশদ্বার মডার্ণ মোড় থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে ক্যাডেট কলেজ ও কারমাইকেল কলেজের মাঝে যাত্রা শুরু হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ের। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে যাত্রা শুরু করলেও ২০০৯ সালে ৪ এপ্রিল মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের নামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল রংপুর ডিসির মোড়ের সন্নিকটে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রতিষ্ঠাকালীন ৬ টি বিভাগে ৩০০ জন শিক্ষার্থী, ১২ জন শিক্ষক, ৩ জন কর্মকর্তা ও ৯ জন কর্মচারী নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি।
২০১১ সালে ৮ জানুয়ারী তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত দিয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসের উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন যাত্রা শুরু করে। এর পর বিশ্ববিদ্যালয়টি চলতে থাকে নতুন উদ্যোমে। বাড়তে থাকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য্য। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৬টি অনুষদভূক্ত ২১টি বিভাগ, ১৬১ জন শিক্ষক, ৮ হাজার শিক্ষার্থী, ৫১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত থাকে সবুজ ঘেরা এই ক্যাম্পাস।
বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪ জন উপাচার্য স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন প্রফেসর ড. এম এ লুৎফর রহমান। তিনি ৬ মাস ২১ দিন উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। একটি টেবিল আর একটি চেয়ার নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজের প্রারম্ভিকা করেন প্রথম এই উপাচার্য। খুব অল্প সময়ে চলে যাওয়ায় তেমন কোন উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারেননি লুৎফর রহমান।
এরপর ৭ মে ২০০৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ভিসি হিসেবে যোগদান করেন প্রফেসর ড. আব্দুল জলিল মিয়া। তিনি যোগদানের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেন যা চোখে পড়ার মত। কিন্তু আন্দোলন আর চাপের মুখে দায়িত্ব স্থায়ী করতে পারেন নি সাবেক এই উপাচার্য। মেয়াদ শেষের এক দিন আগে ২০১৩ সালের ৫ মে তিনিও বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যান ।
এরপর ২০১৩ সালের ৬ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন প্রফেসর ড. এ কে এম নূর-উন-নবী। তিনি ৪ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নেন। তবে তাঁর আমলে অবকাঠামোগত এবং একাডেমিক কোন উন্নয়ন হয় নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ ভিসি হিসেবে ২০১৭ সালের ১৪ জুন যোগদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তিনি যোগদানের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।
ইতোমধ্যে তার হাত ধরে এগিয়ে চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তাঁর যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত আর দক্ষতার সমন্বয়ের ফলে আবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সার্বিক উন্নয়নের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাত্র তিনমাসের মধ্যেই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সবচেয়ে বড় সমস্যা সেশনজট দূর করার উদ্যোগ নেন তিনি। বর্তমানে নতুন ব্যাচের সেশনজট কাটিয়ে আগের ব্যাচগুলোকেও সময় সাপেক্ষে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আশায় বুক বাঁধছেন সেশনজটের হতাশায় পড়ে থাকা পুরাতন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্বদ্যিালয়ে যোগদানের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ করার ঘোষণা দেন ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। শুধু ঘোষণা নয় ঘোষণার সাথে সাথে কাজ করতে শুরু করে দিয়েছেন তিনি। কয়েকটি বিভাগে আসনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ অনার্স প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথমবারের মত নেগেটিভ মার্কিং চালু করে পূর্বঘোষিত ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’এর দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
লেখাপড়ার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলারে ছাত্রছাত্রীদের সক্রিয় রাখার জন্য নিয়েছেন নানা উদ্যোগ। বেগম রোকেয়া ও সাখাওয়াত হোসেন প্রমিলা ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন। যার ফলে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা পেয়েছে অসাধারণ সম্মাননা।
চালু করেছেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর’র কার্যক্রম। ছয়প্লাটুন বিএনসিসি এর অনুমোদন দিয়ে পুরাদমে ট্রেনিং এর যাবতীয় সু-ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যেখানে ছেলেদের জন্য তিনপ্লাটুন ও মেয়েদের জন্য তিনপ্লাটুন।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের সকল সমস্যা দেখার জন্য ‘ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা কেন্দ্রের’ পরিচালক ও সহকারী পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে যা সাবেক উপাচার্যদের সময় ছিলনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুন্দর, মনোরম ও সুবজ ক্যাম্পাস গড়ার জন্য ক্যাম্পাসকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যও কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নির্মাণ করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড।
প্রতিষ্ঠার প্রথম চার বছর অবকাঠামোগত বেশকিছু উন্নয়ন হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির। চারটি একাডেমিক ভবন, একটি প্রশাসনিক ভবন, সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, তিনটি আবাসিক হল, কেন্দ্রীয় মসজিদ, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য ৪টি ডরমেটরি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও স্বাধীনতা স্মারকের ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাকালীন ৬টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও প্রতিষ্ঠার প্রথম তিন বছরের ব্যবধানে বিভাগের সংখ্যা দাঁড়ায় একুশটিতে। নতুন আরো কিছু বিভাগ খুলতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কাজকে এগিয়ে নিতে স্থাপিত হচ্ছে দশ তলা ভবন ড. ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউট। আবার মেয়েদের আবাসিক সমস্যা সমাধান করতে নির্মাণ হচ্ছে শেখ হাসিনা হল।
নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে অনেকদিন পড়ে থাকা ক্যাফেটেরিয়াকে উদ্ভোধন করেন ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাওসিফের সাথে কথা হলে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন সারাদেশে ব্যাপক সুনাম ছড়িয়েছে।
বিসিএস ক্যাডারসহ সরকারী বিভিন্ন চাকরীতে কৃতিত্বের সাথে স্থান করে নিচ্ছে এখানকার শিক্ষার্থীরা। সারাদেশের প্রতিটি জেলা থেকে এখানে এসে পড়াশোনা করছে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী। সমকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় মানে গুণে অনেক এগিয়ে আছে বলে দাবি করেন এই শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ জানান, “আমি দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়কে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে নিয়ে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গত দেড় বছর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজে যে স্থবিরতা ছিলো তা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্স বানানোর জন্য দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে ইতোমধ্যে দশটির বেশি এমওইউ (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) করেছি। সেশনজট কাটানোর জন্য শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছি। এছাড়াও অন্যান্য সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। আশা করছি খুব কম সময়ের মধ্যেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মানুষের পজিটিভ ধারণা তৈরী হবে।”
News: The Daily Campus