31/08/2023
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দুর্নীতি এবং উচ্চশিক্ষা
"বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা: সঙ্কট এবং সম্ভাবনা"
শিরোনামে একটি গবেষণা প্রায় শেষ করে এনেছি। বই আকারে সেটা প্রকাশিত হবে।
গবেষণা করতে গিয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দুর্নীতির চমৎকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম আছে, শিক্ষার্থীদের সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসতে হলে সত্তর শতাংশ উপস্থিতি থাকা দরকার। যদি পঞ্চান্ন শতাংশ উপস্থিতি থাকে তাহলে জরিমানা দিয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে। দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় প্রধান, বিভাগের শিক্ষক, প্রশাসন মিলে এই সব ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা একটি ক্লাসও করেনি, কিন্তু বিভাগীয় প্রধান আর শিক্ষকরা মিলে সত্তর শতাংশ উপস্থিতি দিয়ে দিয়েছে তাদের।
[ প্রকাশিত গ্রন্থে নাম ধাম প্রমাণ সব থাকবে। দিন তারিখ সহ এইসব অনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। কারো যদি এ রকম আরো তথ্য জানা থাকে, আমাকে প্রমাণ সহ পাঠালে আমার গবেষণা গ্রন্থে স্থান পাবে। ]
যারা পঞ্চাশ বা পঞ্চান্ন শতাংশ ক্লাস করেছে তারা জরিমানা দিয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। আর কোন ক্লাস না করে কিছু শিক্ষার্থী বিভিন্ন শিক্ষকের দুর্নীতিতে সত্তর শতাংশ উপস্থিতি পেয়েছে। অনুষদের ডীনরা তা জেনেও চুপ। মিলেমিশে দুর্নীতি করছে। যাঁরা বিভাগের আদর্শবান শিক্ষক, তাঁরা এসব অনিয়ম করতে চান না, করেন না। কিন্তু বিভাগীয় প্রধান বাকি শিক্ষকদের নিয়ে সেই সব আদর্শবান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলেন। সেই শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখতে চান না। কিছু শিক্ষককে বাধ্য করেন আদর্শবান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে সেখানে স্বাক্ষর করতে। শিক্ষকদের দুর্নীতি কতদূর গিয়েছে!
শিক্ষার্থীরা যেহেতু আদর্শবান শিক্ষককে পছন্দ করেন, সেজন্য বিভাগীয় প্রধান তাঁকে আর ক্লাস দেন না। কারণ আদর্শবান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ থাকুক তা দুর্নীতিগ্রস্থ বিভাগীয় প্রধান এবং প্রশাসন চায় না। [ অপরাধীদের নাম সহ সব প্রমাণ থাকবে মূল গ্রন্থে ]
শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতির জন্য একটা নম্বর দেওয়া হয়ে থাকে যা চূড়ান্ত পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়। এতে সেমিস্টারের চূড়ান্ত ফলাফলে হেরফের ঘটে। যারা কোনো ক্লাস না করেও শিক্ষকদের দুর্নীতির জন্য সত্তর শতাংশ উপস্থিতি পায়, তাদের ফলাফলেও সেই নম্বর যোগ হয়। খুবই অন্যায় সেটা। শিক্ষার্থীরা যারা নিয়মিত ক্লাস করে, যখন তারা এসব অনিয়ম নিয়ে মুখ খুলতে চায়, শিক্ষক এবং বিভাগীয় প্রধান তখন তাদের ভয় দেখান, বলেন মুখ খুললে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবেন। কী ভয়াবহ অবস্থা কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের!
ঘটনার সেখানেই শেষ নয়। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ইন্ধন জোগায় আদর্শবান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলতে। কখনো কখনো শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর জাল করে অভিযোগ গঠন করা হয়। শিক্ষকদের মধ্যে কেউ কেউ যারা নিয়মিত ক্লাস করে না, পড়াশুনা করে না, সেইসব শিক্ষার্থীদের নিয়ে এসব অভিযোগপত্র লেখে। ফলে দেখা যায় দুটো অভিযোগপত্রে ভাষা এবং বক্তব্য হুবহু এক। শিক্ষার্থীদের চাপ দেয়া হয় সেসব অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করতে। প্রশাসন এসবের সঙ্গে যুক্ত থাকে। পরবর্তীতে আদর্শবান শিক্ষার্থীরা কখনো কখনো এসব তথ্য ফাঁসও করে দেয়। [ বহু প্রমাণ আছে]
শিক্ষকদের লেখাপড়ার মান নিয়ে কথা বলতে গেলে লজ্জা পেতে হয়? বহু শিক্ষকের না আছে পড়াশুনা, না তাঁরা শুদ্ধভাবে বাংলা বাক্য গঠন করতে পারেন। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষকরা পর্যন্ত শুদ্ধ বাংলা লিখতে পারেন না। কিন্তু তাঁরা বাংলা সাহিত্য পড়ান, বাংলা ভাষার উপর ক্লাস নেন। যাঁরা ধ্বনিতত্ত্ব পড়ান, তাঁদের নিজেদের উচ্চারণ ঠিক নেই। শিক্ষার্থীরা টাকা দিয়ে ভর্তি হয়, কিছু না শিখেই স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর সনদপত্র নিয়ে চলে যায়। দেখা গেছে, বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মানের সনদপত্রধারী বাংলা সাহিত্যের দুটা উপন্যাসও পড়েনি। নাটক, প্রবন্ধ কিছুই পড়েনি। পড়বে কি, কোনো ক্লাস না করেই সত্তর শতাংশ উপস্থিতি। পাঁচজন উপন্যাসিক বা নাট্যকারের নাম বলতে পারে না, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের স্নাতকোত্তর! বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার এই হাল হয়েছে। বলা যায়, সনদপত্র বিক্রি হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। শিক্ষাদান করা বা শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ গড়ে দেয়ার মতো শিক্ষক নেই বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু বিভাগে। শিক্ষকদের না আছে লেখালেখি, না আছে গবেষণা, না আছে পড়াশুনা। শিক্ষার্থীদের তাঁরা কী দেবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন অযোগ্য শিক্ষক দিয়ে ভরে ফেলেছে বিশ্ববিদ্যালয়। অযোগ্যরা সব নানারকম তদবির করে এসেছে একদিকে। অন্য দিকে যাঁরা যোগ্য নন, যোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগ দিতে তাঁরা ভয় পান। কারণ তাহলে তাঁদেরই নিজেদের অযোগ্যতা ধরা পড়ে যাবে। তাই নিজেদের অযোগ্যতা ঢেকে রাখতে আরো অযোগ্যদের নিয়োগ দেন। অযোগ্যরা একে অপরকে বাহ্বা দেন, আর আদর্শবান শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন।
বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁদের গবেষণা আছে, প্রচুর বইপত্র আছে তাঁদেরকে মর্যাদা দেয়া হয় না। খুব পরিকল্পিতভাবে তাঁদের সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়।
বহু বিশ্ববিদ্যালয় এখন অনেক ক্ষেত্রে পড়াশুনার বাইরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সামনের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত সেমিনারের গবেষণা প্রবন্ধের একটি সার অংশ। যদি কারো কাছে আরো তথ্য থাকে যুক্ত করা হবে।
রহমান চৌধুরী স্যার,