06/07/2022
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি (৬ জুলাই, ২০২২)
অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নপূর্বক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ করার আহ্বান
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা অবস্থায় নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন করে যত্রতত্র ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা প্রতিহত করা হবে
গত ৩০ মে ২০২২ তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় স্থপতি আহসানউল্লাহ মজুমদার জানান, ১৪৪৫ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়নি! অথচ আমরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে একনেক সভায় বারংবার বলতে শুনেছি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য মাস্টারপ্ল্যানের অপরিহার্যতার কথা বলতে। আমাদের চলমান আন্দোলনের অন্যতম দাবিও মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুষম ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আমরা বারবার বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছি, দ্বিতীয় ধাপের ১৪টি স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনকাঠামোকে প্রাধান্য দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ন ও ঝুকিপূর্ণ ভবনসমূহ ভেঙে সেই স্থানে প্রয়োজনীয় নতুন ভবন নির্মাণ করা, ক্লাসরুম সঙ্কটে থাকা বিভিন্ন বিভাগ ও অনুষদের জন্য একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা, দীর্ঘ বছর ব্যবহারোপযোগী ভবনসমূহ অপ্রয়োজনীয়ভাবে না ভাঙা, কেন্দ্রীয় সুয়ারেজ সিস্টেম নিশ্চিত করাসহ প্রাণ-প্রকৃতির সর্বনিম্ন ক্ষতি করে সকল সঙ্কটের সমাধান করা সম্ভব কেবল মাত্র মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের মাধ্যমে। প্রশাসন আমাদের দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত আমাদের জানাবে বললেও বাস্তবে তাদের কার্যক্রমে আমরা কোনোরকম বিবেচনা কিংবা অংশীজনদের মতামতের কোনো প্রতিফলনই দেখতে পাইনি। সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি, দুইটি সভার মাধ্যমে উঠে আসা অংশীজনদের গুরুত্বপূর্ণ মতামতকে তোয়াক্কা না করে পূর্বনির্ধারিত স্থানসমূহেই নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের মাধ্যমে স্থাপনা নির্মাণের পাঁয়তারা চালাচ্ছে প্রশাসন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনরা প্রতিবাদ জানালে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূহুর্তের মধ্যে কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়াই যত্রতত্র স্থাপনা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধৃষ্টতাও বর্তমান প্রশাসন দেখাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হয় যে, বর্তমান প্রশাসন পরিবেশের প্রতি যত্নশীল নয় এবং টেকসই উন্নয়ন তাদের লক্ষ্য নয়। বরং ছলে-বলে-কৌশলে যত দ্রুত সম্ভব বহুতল ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করাই কেবল তাদের উদ্দেশ্য। এই প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো ও লুকোচুরির মধ্য দিয়ে জনগণের রক্ত পানি করা অর্থের শ্রাদ্ধই কেবল নিশ্চিত হয় বলে আমরা মনে করি।
মাস্টারপ্ল্যান ও অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করলেও শুরু থেকে এই কমিটিকে একেবারেই অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের কাজের ক্ষেত্রেও তাঁদের মতামত গ্রহণের দৃষ্টান্ত আমাদের কাছে দৃশ্যমান নয়। অথচ ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নতজানু হয়ে তদানীন্তন প্রশাসন তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশ প্রচার করে। সেটিতে উল্লেখ ছিলো, “বর্তমানে বিশেষজ্ঞ কমিটি (মাস্টারপ্ল্যান পর্যালোচনা কমিটি) পুনর্গঠন করা হবে।” আরো উল্লেখ ছিলো, “প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিরীক্ষা করার জন্য বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা হবে” এবং “প্রকল্পের ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যয়ের হিসাব ও কাজের অগ্রগতি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিস থেকে সর্বদলীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে গঠিত কমিটিকে অবহিত করবে।” সেই মেনে নেওয়া দাবিসমূহের বাস্তবায়নের দায়িত্ব বর্তমান প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। উপরন্তু বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ নূরুল আলম পূর্বতন প্রশাসনে উপ-উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলেন। সঙ্গত কারণেই বর্তমান উপাচার্য আগের প্রশাসনের মেনে নেওয়া দাবি বাস্তবায়নের দায়িত্বকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, বর্তমান প্রশাসনও পূর্বতন প্রশাসনের ন্যায় ছলচাতুরী, লুকোচুরি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারদর্শী। প্রশাসন দীর্ঘ সময় যেটিকে মাস্টারপ্ল্যান বলে চালিয়েছে, তা পর্যালোচনার কোন উদ্যোগ আমরা দেখিনি। প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার ২৭ মাস পরে সেটি যে কোনো মাস্টারপ্ল্যানই নয়, স্থপতি আহসানউল্লাহ মজুমদারের এমন স্বীকারোক্তির পরেও বর্তমান প্রশাসন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে একেবারেই আগ্রহী নয় বলে আমাদের মনে হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে এখন পর্যন্ত গঠন করা হয়নি কোন তদারকি কমিটি। আমাদের প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হোক, সেটি আমাদের চাওয়া নয়। আমরা চাই প্রশাসন একটি সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে টেকসই ও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করুক এবং সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসে প্রাণ-প্রাচুর্যের ভবিষ্যত নিরাপত্তাও নিশ্চিত হোক।
বর্তমান প্রকল্পের ডিপিপি ও লেআউট প্ল্যানটি রাখা হয়েছে সকলের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এর মধ্য দিয়ে মতামত প্রদান, প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবগত হওয়ার পথকে রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক মারফত ডিপিপি’তে তথ্য গোপন করে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের পাঁয়তারার ব্যাপারেও আমরা অবগত হয়েছি।
মাস্টারপ্ল্যানকে বলা হয় ফিউচার এক্সপানশনের ব্লুপ্রিন্ট। জাহাঙ্গীরনগরে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের পরেও ভবিষ্যতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো স্থাপনার জরুরত দেখা দিতে পারে। এই যেমন, বর্তমান প্রকল্পে বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ এবং ইনস্টিটিউটের ক্লাসরুম সঙ্কটকে আমলে নেওয়া হয়নি। এর ফলে নিশ্চিতভাবেই অদূর ভবিষ্যতে আরো স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। সেই স্থাপনাসমূহের নির্মাণও যদি কোনো মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে না হয়, তাহলে সেটি সমাধানের চেয়ে সঙ্কটকেই ডেকে আনবে বেশি। এছাড়াও এই পুরো প্রকল্পের কোথাও ড্রেনেজ এবং সুয়ারেজ সিস্টেমের উল্লেখ নেই। এত এত ভবনের বর্জ্য অপসারণ এবং বর্ষাকালে ভারী বর্ষণসৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে সেন্ট্রাল সুয়ারেজ সিস্টেমের বিকল্প নেই! এভাবে পরিকল্পনাহীনভাবে একের পর এক ভবন নির্মাণ করলে ভবিষ্যতে জনগণের কষ্টার্জিত টাকায় নির্মিত স্থাপনা ভেঙে সুয়ারেজ সিস্টেমের ব্যবস্থা করতে হতে পারে। প্রয়োজনীয় স্থাপনা নির্মাণের বিরোধী আমরা কখনই নই। তাই দ্বিতীয় ধাপসহ বর্তমান প্রকল্পের প্রত্যেক ধাপ এবং সকল ভবিষ্যত কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যান অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন লঙ্ঘন করে জাহাঙ্গীরনগরে চলছে উনয়ন প্রকল্পের কাজ। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নপূর্বক কাজ শুরু না করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা অবস্থায় রাতের আঁধারে কিংবা লুকোচুরি করে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের মধ্য দিয়ে অংশীজনদের মতামতকে গুড়িয়ে দিয়ে স্থাপনা নির্মাণের পাঁয়তারা দৃষ্টিগোচর হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য অংশীজনেরা তা প্রতিহত করবে।
রায়হান রাইন
মুখপাত্র,
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর