22/05/2026
রাজমিস্ত্রীর ছেলে! আমেরিকায় গিয়ে এক সাবজেক্টে ফেল, স্কলারশিপ শেষ!
ওমর ফারুকের জন্ম হয়েছিল এমন এক পরিবারে যেখানে একসময় অভাব ছিল না। দাদা মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত জমিজমা ছিল ধান চাল কিনতে হতো না। কিন্তু অসুস্থতার চিকিৎসা করতে করতে প্রায় সব জমি বিক্রি হয়ে যায়। আব্বা ছিলেন একমাত্র ছেলে। চার বোন, নিজের পরিবার সব দায়িত্ব একা কাঁধে নিতে নিতে জীবনটা খুব দ্রুতই কঠিন হয়ে ওঠে।
আব্বা খুব বেশি পড়াশোনা জানতেন না, হয়তো ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত। কিন্তু আজও বিশ্বাস করি, আব্বাই ছিলেন আমার জীবনের সবচেয়ে ট্যালেন্টেড মানুষ। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন মিথ্যা বলবা না, দুর্নীতি করবা না, দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করবা।
ছোটবেলায় অভাবের কারণে আমাকে ফুফুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফুফুর কোনো ছেলে ছিল না। তাদের বাড়িতে থেকেছি, জমিতে কাজ করেছি, সবজি তুলেছি, বিক্রি করেছি, সংসারের কাজ করেছি। তখনও স্কুলে যাওয়া শুরু হয়নি। পরে সরাসরি ক্লাস ফোরে ভর্তি হই। মাত্র ছয়দিন স্কুলে গিয়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছিলাম।
ইংরেজি শিখেছি পুরোপুরি নিজের চেষ্টায়। এডুকেশন উচ্চারণ করতাম এডুকে টায়ন, এক্সামিনেশন উচ্চারণ করতাম এক্সামিনার টায়ন। শেখানোর মতো কেউ ছিল না। কিন্তু বাবা একটা জিনিস বলতেন বড় স্বপ্ন দেখাতে।
ছোটবেলা থেকেই বাবা খেলাধুলা করতে দিতেন না। উনার ভয় ছিল, কোথাও ইনজুরি হলে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তো তার নেই। খুব সুন্দর করেই বুঝাতেন। যদি মাঠে খেলতে যেতাম, দূর থেকে আব্বার গম্ভীর ডাক আসত। একসময় এমন অবস্থা হলো পাড়ার ছেলেরাও খেলায় নিত না। বলত তোমার বাপ আবার আইসা নিয়ে যাইবো!
অন্যের বাবারা বাজার থেকে মাছমাংস নিয়ে ফিরতেন, আর আমার বাবা দিনমজুরি শেষে এক রিম কাগজ আর এক ডজন কলম নিয়ে ফিরতেন। বলতেন যাও একটা অংক করো। আশেপাশের কেউ উনাকে উৎসাহ দিত না। সবাই বলত এত পড়াইয়া লাভ কী? এত ছোট মানুষ চাকরি বাকরি কিছুই পাইবো না। গ্যারেজে কাজে দিয়ে দেন।
কিন্তু আমার বাবা হাল ছাড়েননি। আমি যদি বলতাম এত টাকা লাগবে আব্বা বলতেন গায়ের রক্ত বিক্রি করে হলেও তোমারে পড়ামু। আজ বুঝি হয়তো উনি জানতেন না শুধু টাকা দিলেই সব হয় না। কিন্তু উনার বিশ্বাস, উনার মোটিভেশন এগুলোই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
তখন আমাদের ঘরে বিদ্যুৎ বিল দেওয়ারও সামর্থ্য ছিল না। ২৫-৩০ টাকার একটা বাল্ব জ্বালানোও কঠিন হয়ে যেত। তাই পাশের বাড়ির লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে বই পড়তাম। নতুন বই কেনা তো দূরের কথা, আগের ক্লাসের বড় ভাইদের পুরনো বই নিয়েই পড়াশোনা চলত।
বর্ষাকালে যখন লেবারের কাজ থাকত না ঘরে অভাব থাকত তখনও রাতে ঘুমানোর আগে আব্বা বলতেন বাবা একটা গান গাও। একটা গানের লাইন আজও মনে আছে জীবনের পথ ভর উঁচু নিচু, চলতে গেলে ব্যথা পাবেই কিছু আজও জীবনের কঠিন সময়ে বাবা সেই কথাই মনে করিয়ে দেন।
ক্লাস এইটে ওঠার পর ভয়ংকর সিরিয়াস হয়ে পড়াশোনা শুরু করি। কারণ ছোটবেলা থেকেই দেখেছি কীভাবে দুর্বল মানুষের উপর সমাজ অত্যাচার করে। মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে, ক্ষমতা দেখিয়ে, জমি দখল করে, অপমান করে। আমি দেখেছি আমার বাবাকে চুপচাপ সব সহ্য করতে। একসময় আমার ভেতরে ভয়ংকর রাগ জন্মেছিল। মনে হতো, এমন শক্তিশালী হতে হবে যেন কেউ আর কখনো আমাদের মতো মানুষকে অপমান করতে না পারে। পরে বুঝেছি, সত্যিকারের শক্তি ধ্বংসে না চরিত্রে।
এর মধ্যেই ভর্তি হলাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়াতে। গ্রামের একটা দরিদ্র পরিবারের ছেলের কাছে এই কলেজের ড্রেসটাই ছিল স্বপ্নের মতো। সকালে টিউশন পড়াতাম, কলেজ করতাম, রাতে আবার পড়তাম। আমাদের ঘরের অবস্থা এত খারাপ ছিল যে বৃষ্টি এলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ত। মেট্রিক পাশ করার আগ পর্যন্ত জানতামই না ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতে কী করতে হয়। কোনো মেন্টর ছিল না কোনো গাইডলাইন ছিল না। এক বড় ভাই প্রথম আমাকে বলেছিল বুয়েট বলে একটা জায়গা আছে। তখন বুঝলাম স্বপ্ন দেখারও একটা ঠিকানা আছে।
পরে শহরে গিয়ে মেস লজিং শুরু করলাম। দুই বেলা পড়াবো, তিন বেলা খেতে দিবে। মাসে হাতে থাকত ২৫ টাকা। সেই টাকা দিয়ে রিকশা ভাড়া, সাবান, কাপড় ধোয়ার সার্ফ সব চালাতে হতো। প্রতিদিন দোয়া করতাম আল্লাহ আমি যেন অসুস্থ না হই। এক বাসায় আমাকে সবসময় নিম্নমানের খাবার দেওয়া হতো। একদিন বৃষ্টির মধ্যে ভুল করে ঘরের ভেতর দিয়ে যেতে গিয়ে দেখি, বাসার মালিকেরা গরুর মাংস দিয়ে খাবার খাচ্ছেন। তখন বুঝলাম, আমার জন্য আলাদা করে নিম্নমানের খাবার রাখা হতো। সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।
সেই বাসা ছেড়ে পরে আরেকটা গরিব পরিবারের বাসায় পড়াতে যাই। টিনশেডের ছোট ঘর, রিকশার টায়ার টিউব মেরামত করেই সংসার চলে। কিন্তু ওদের ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ঈদের সময় তারা দুইটা নতুন শার্ট কিনে এনে বলেছিল স্যার কোনটা আপনারে বেশি সুন্দর লাগবে? ওই কালো শার্টটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম নতুন ঈদের শার্ট। আমি সেটাই পাঁচ-সাত বছর পরেছি। আজও কালো শার্ট পরলে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।
ইন্টারমিডিয়েটে সায়েন্স পড়া শুরু করার পর বুঝলাম, প্রাইভেট ছাড়া টিকে থাকা কঠিন। তখন কিছু বড় ভাই আমাকে সাহায্য করেছিলেন। একজন কেমিস্ট্রি স্যার আমাকে ফ্রিতে পড়িয়েছিলেন। বইও জোগাড় হয়ে গেল। সেই সাহায্যগুলো না পেলে হয়তো আমি আর সামনে এগোতে পারতাম না।
তারপর শুরু হলো ঢাকায় বুয়েট কোচিংয়ের যুদ্ধ। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফর্ম কেনার জন্য রক্ত বিক্রি করেছি। এক ব্যাগ রক্তের দাম ছিল ৮০ টাকা। অনেক অনুরোধ করে ২০০ টাকা পেয়েছিলাম। কারণ জানতাম, যদি আমি থেমে যাই আমার পুরো পরিবার থেমে যাবে।
ঢাকায় আত্মীয়ের বাসায় ফ্লোরে ঘুমাতাম। একদিন রাত ১০টায় বাসা থেকে বের করে দেওয়া হলো, কারণ বাসায় মেহমান এসেছে। সেই রাতে একটা বাসে উঠে উত্তরা চলে যাই দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাসায়। তারা আমাকে চিনতেনও না, তবুও দরজা খুলে থাকতে দিয়েছিলেন। আজও সেই মানবিকতা ভুলতে পারিনি। এরপর ঢাকায় ১২ জন ড্রাইভারের সাথে মেঝেতে থেকেছি, ঘুমিয়েছি। অনেকদিন শুধু দুধ-ভাত খেয়ে থেকেছি। জন্ডিস হয়েছিল। বন্ধুর বেল্ট ধরে সিঁড়ি ভেঙে ক্লাসে উঠেছি। কিন্তু পড়াশোনা ছাড়িনি।
ফার্মগেটের ব্রিজে পার্টটাইম চাকরির পোস্টার দেখে একটা চাকরি নিয়েছিলাম। পরে বুঝলাম, সেটা আসলে ইন্স্যুরেন্সের ফাঁদ। নিজের সব টাকা দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুললাম, কিন্তু পরদিন গিয়ে দেখি বসার চেয়ার পর্যন্ত নেই। সেদিন মনে হয়েছিল, আমি সব হারিয়ে ফেলেছি। থাকার মতো টাকা নেই, খাওয়ার মতো টাকা নেই, আর কোচিংও করা হয়নি। বুয়েটে এক্সাম দেওয়াও হয়নি। স্বপ্নটা সেদিন ভেঙে গিয়েছিল। কাউকে কিছু না বলে ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে আসি।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভাব ছিল মেন্টর শিপের অভাব। কীভাবে সামনে এগোতে হয়, কোন পথে গেলে নিজের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পাওয়া যায় এসব বুঝিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। কিন্তু একটা জিনিস ছিল ভেতরে আগুন ছিল। দারিদ্র্য, অপমান, অনিশ্চয়তা সবকিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করার আগুন।
ঠিক সেই সময় আমার জীবনে আসে আসমা। প্রথমে ভালো লাগা, পরে গভীর ভালোবাসা। কিন্তু তার জীবনেও নেমে এলো ভয়াবহ ঝড় অসুস্থতা, মায়ের মৃত্যু। আমি গিয়ে শুধু বলেছিলাম তুমি আমার সাথে ঢাকা যাইবা? সে বলেছিল হ্যাঁ যামু। সেদিন কোনো আই লাভ ইউ ছিল না। ছিল শুধু একসাথে পথ চলার সিদ্ধান্ত।
আমার নিজের কিছুই ছিল না। খাওয়ার মতো টাকা ছিল না, ঘর ছিল না, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তবুও বলেছিলাম, আমি ওকেই বিয়ে করমু। আব্বা ৫০০ টাকা ধার করে আমাকে নিয়ে তার বাসায় গিয়েছিলেন। আসমা এক কথায় বলেছিল, জীবনে যা করা লাগে, আমি সব করমু।
বিয়ের পর নতুন বউ হয়েও সে পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। আমার অসুস্থ দাদীর সেবা করেছে, ছোট ভাইকে মানুষ করেছে, গ্রামের স্কুলে পড়িয়েছে, প্রাইভেট পড়িয়েছে। মাটির ঘরে থেকেছে, ভাঙা ঘরে থেকেছে, পানি পড়া ঘরে থেকেছে। কিন্তু কোনোদিন অভিযোগ করেনি। আমি ঢাকায় লড়েছি, সে গ্রামে লড়েছে। আমি স্বপ্ন দেখেছি, সে সেই স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন বানিয়েছে। তখন বুঝেছি, সংসার শুধু ভালোবাসা দিয়ে না দায়িত্ব দিয়ে টিকে থাকে।
এক রাতে হঠাৎ এক বন্ধুকে ডাকতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ডাকার আগেই ভেতর থেকে তার বাবার কথা কানে ভেসে এলো বখাটে ছেলেটার সাথে বেশি ঘুরাফেরা করিস না, আড্ডাও দিবি না। কথাগুলো খুব কাছ থেকে শুনেও আর তাকে ডাকিনি। নিঃশব্দে ফিরে এসেছিলাম। পুরো পথজুড়ে শুধু একটা কথাই মাথায় ঘুরছিল আমি কি সত্যিই এত খারাপ? যে আমি ইন্টারমিডিয়েটে এমন রেজাল্ট করেছি, যা আমাদের পুরো গ্রামে আজও কেউ করতে পারেনি, সেই আমিই সবার চোখে বখাটে!
এদিকে ঋণের চাপে আব্বা ঘর ছেড়ে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে চলে গিয়েছিলেন। পাওনাদাররা বাড়িতে এসে চিৎকার চেঁচামেচি করত। একসময় ঘরের টিন খুলে নিয়ে যায়, গাছ কেটে নিয়ে যায়। নিজের বাড়িতে দাঁড়িয়ে এসব অসহায়ের মতো দেখা ছাড়া তখন আর কিছুই করার ছিল না।
সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবো। রেজাল্ট ভালো ছিল, তাই বিশ্বাস ছিল ওয়েভার পাবো। মনে মনে হিসাব কষে রেখেছিলাম প্রতি সেমিস্টারে ৪ এ ৪ রাখতে পারলে আর টাকা লাগবে না। আর যদি কখনো সেই অবস্থাও না থাকে, তাহলে ঢাকায় রিকশা চালিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাবো।
ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের ঢাকা ক্যাম্পাসে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরিকল্পনা করলাম। কিন্তু ভর্তি হওয়ার মতো টাকাও ছিল না। সেই সময় আমার ফুফু সুদে টাকা এনে আমাকে বিশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। আম্মা কষ্ট করে জোগাড় করেছিলেন আরও পাঁচ হাজার টাকা। আর আসমা প্রতিটা মুহূর্তে সাহস জুগিয়েছিল। এই সামান্য টাকা অনেক মানুষের ত্যাগ আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়েই শুরু হয়েছিল নতুন পথচলা।
ঢাকায় এসে শুরুটা সহজ ছিল না। সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল একটা টিউশনি খুঁজে পাওয়া। দিনের পর দিন ঘুরেও যখন কিছু হতো না, তখন নিজেকেই খুব অসহায় লাগত। ভার্সিটির অনেক বন্ধু মজা করে আতেল বলে ডাকত। কখনো বন্ধুদের খাবার খেয়েছি, তাদের কাপড় পরেছি, আবার কখনো তাদের বাজার পর্যন্ত করে দিয়েছি। আত্মসম্মানকে অনেক সময় চুপ করিয়ে রাখতে হতো।
তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। একসময় টিউশনি পাওয়া শুরু হলো। তারপর গুলশান, ধানমন্ডি, বনানীর মতো জায়গায় পড়াতে যেতাম। ভালো টাকাও আসতে শুরু করল। নিজের খরচ চালানোর পর বাড়িতেও টাকা পাঠাতাম। তখন মনে হতো, এত কষ্টের মাঝেও হয়তো আল্লাহ একটা পথ খুলে দিচ্ছেন।
দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে তখন কোনো ধারণাই ছিল না। একদিন রাস্তায় জিআরই কোচিং এর বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। পরে বুঝেছিলাম সেটা “গ্রি” না জিআরই। কিন্তু সেই ভুল উচ্চারণের ভেতর দিয়েই জন্ম নিয়েছিল আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন।
তখন জানতাম না জিআরই কী, টোফেল কী, কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়। শুধু জানতাম আমাকে একটা পথ বের করতেই হবে। ওয়াশরুমের দেয়ালে, বেডরুমের দরজায় জিআরইর ভোকাবুলারি লিখে টানিয়ে রাখতাম। বারবার পড়তাম, মনে রাখার চেষ্টা করতাম।
জিআরই আর টোফেল দেওয়ার পর শুরু হলো ইউনিভার্সিটিগুলোতে মেইল করা। একটার পর একটা মেইল পাঠাতাম, কিন্তু কোনো রিপ্লাই আসত না। তবুও থামিনি। অবশেষে একদিন একটা ইউনিভার্সিটি
সাউথ ডাকোটা মাইনস থেকে অ্যাসিস্ট্যান্টশিপসহ অফার লেটার পেলাম।
কিন্তু নতুন সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ালো। ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে হবে। অথচ নিজের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টই ছিল না, টাকাও ছিল না। সেই সময় গুলশানে আমার এক স্টুডেন্টের বাবা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজও সেই ঋণ হৃদয়ে বহন করি।
যেদিন ভিসা পেলাম, সেদিন আব্বা সিএনজিতে ছিলেন। খবরটা শোনার পর তিনি আনন্দে সিএনজি থেকে নেমে উল্টো পথে দৌড় দিতে শুরু করেছিলেন। এরপর বন্ধু আর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করলাম। এভাবেই এক বুক স্বপ্ন আর হাজারো কষ্ট নিয়ে আমেরিকার পথে রওনা হয়েছিলাম।
আমেরিকায় আসার পরও যুদ্ধ থামেনি। এক সেমিস্টারে একটা কোর্সে ফেল করেছিলাম। তখন নিজের কোনো কম্পিউটারই ছিল না। শেষ পর্যন্ত অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চলে যায়। মানে নিজের টাকায় পড়তে হবে, না হলে দেশে ফিরে যেতে হবে। সেই সময়টা ছিল জীবনের সবচেয়ে অসহায় সময়গুলোর একটি।
কিন্তু হাল ছাড়িনি। আবার নতুন করে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করলাম। আল্লাহর রহমতে আগের ইউনিভার্সিটির চেয়েও বড় একটি ইউনিভার্সিটি
সাউদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি কার্বনডেল থেকে ফান্ডিংসহ অফার পেলাম। সেখান থেকেই শেষ পর্যন্ত গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করি। এর পর বিশ্ববিখ্যাত স্টানফোর্ড ইউনিভার্সিটি তে পড়ি।
গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর Amazon, Apple, Facebook Meta তে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। শুধু কাজই না হায়ারিং টিমেও ছিলাম। অসংখ্য চাকরিপ্রার্থীর ইন্টারভিউ নেওয়ার সুযোগ হয়েছে। আর এখন Microsoft-এ যোগ দিতে যাচ্ছি।
জীবন আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছে স্বপ্ন দেখতে টাকা লাগে না, কিন্তু সেই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে অসীম ধৈর্য লাগে। আর একজন মানুষ যদি পাশে বিশ্বাস নিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে অসম্ভব বলেও হয়তো কিছু থাকে না।
© Scholarship Funding with Low CGPA