21/05/2025
"রোস্টারভুক্ত"—এক সময় গর্বের একটা শব্দ ছিল। আজ সেটা যেন শুধু বোবা এক প্রতীক্ষার নাম।
আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম—সেটা শুধুই নিজের ছিল না।
সেটা ছিল পরিবারের,
ভবিষ্যতের,
একটা সুন্দর আর নির্ভরযোগ্য জীবনের।
দিনরাত কষ্ট করে ভাষা শিখেছি,
ঘুম হারিয়ে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টেছি।
প্রতিটি লটারি, প্রতিটি আবেদন ছিল জীবনের একেকটা যুদ্ধ।
কে যেন বলে দিয়েছিল—নাম উঠলেই সব বদলে যাবে।
এই স্বপ্নের পেছনে হেঁটে হেঁটে হারিয়েছি অনেক কিছু—
কারও মা গহনা বন্ধক রেখেছেন,
কারও বাবা শেষ গরুটা বিক্রি করেছেন,
কারও ছোট ভাইয়ের টিউশনের টাকাও EPS-এর নাম লিখে দিয়েছে।
কারও হাতছাড়া হয়েছে চাকরি,
কারও সুযোগ ছিল বিদেশে যাওয়ার—তা ফিরিয়ে দিয়েছে,
কারও ব্যবসার স্বপ্ন থেমে গেছে এই লাইনের আশায়।
আমরা জানি, আমরা মধ্যবিত্ত।
আমাদের স্বপ্ন সবসময় পরিবারের চারপাশে ঘোরে।
চেয়েছিলাম বাবাকে গর্ব করে বলতে বাবা আর তোমাকে কাজ করতে হবে না,
মায়ের ওষুধে যেন টাকার টান না পড়ে,
বোন যেন লেখাপড়া শেষ করতে পারে—ভালো ঘরে বিয়েও হয়,
ছোট ভাইয়ের শখ যেন একটিবারের জন্যও অপূর্ণ না থাকে।
আর আজ?
রোস্টারে থেকেও নিরব।
চারপাশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—
"কি হলো, ভাই? কবে যাচ্ছেন?"
মা-বাবা ভরসায় ছিল, এখন জিজ্ঞেস করে—
"তুই তো পাস করছিলি, এখনও ডাক আসছে না কেন?"
চুপ করে থাকি।
কারণ, উত্তর আমাদের কাছেও নেই।
প্রতিবেশী কেউ কেউ টিটকারি করে,
তাও সহ্য করি।
কারণ ব্যাখ্যা করার ভাষাও এখন হারিয়ে গেছে।
আজ যারা রোস্টারে, তারা বোঝে—
পথটা বেশিরভাগের জন্য এবার থেমে যাচ্ছে।
ঘোষণা নেই, অভিযোগ নেই—
শুধু একটা চুপচাপ, হৃদয়বিদারক থেমে যাওয়া।
সব দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের নাম শুনলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে।
তবুও কাঁদি না।
চোখ ভিজে যায়, কেউ দেখার আগেই মুছে ফেলি।
কারণ এই কষ্ট কাউকে দেখানো চলে না।
এটা আমাদের হার না মানা স্বপ্নের যন্ত্রণা।
এটা কোনো অভিযোগ নয়।
এটা কিছু স্বপ্নভাঙা মানুষের নিঃশব্দ আর্তনাদ।
যাদের হাতে শুধু অপেক্ষা, আর হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা এক হাহাকার।
আমরা জানি, পরিশ্রম কম ছিল না।
হয়তো কপালটাই একটু দূরে ছিল।
তবুও এই ব্যথাগুলো—এই লেখার মধ্যে রেখে দিলাম।
হয়তো কেউ পড়বে, বুঝবে,
হয়তো কেউ নিজের হারানো গল্প খুঁজে পাবে।
---