30/11/2025
রূপান্তরিত শিক্ষা এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু সংকট
--এম এ খায়ের --
আধুনিক, সমৃদ্ধ, উন্নত ও শান্তিময় বাংলাদেশ গঠনে গতানুগতিক শিক্ষা থেকে বের হয়ে শিক্ষার বিষয়বস্তু ও শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে একটি মৌলিক রূপান্তর বা ট্রান্সফর্ম প্রয়োজন। শিক্ষায় রূপান্তর, পরিবর্তন, পরিমার্জন, সম্প্রসারণ ও সংযোজন-বিয়োজন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কারণ যুগের পরিবর্তন, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নীতি-দর্শনের উৎকর্ষ সাধনের সাথে শিক্ষার পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুর পরিবর্তন ও রূপান্তর হবেই।
আমাদের প্রয়োজন একটি বৈপ্লবিক শিক্ষাদর্শন, যা পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তনসহ শিক্ষার লক্ষ্য ও প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক পুনর্গঠন নির্দেশ করে। শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকবে শিক্ষার্থী—যেখানে তাদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, বরং জীবনব্যাপী শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা হবে।
রূপান্তরিত শিক্ষা প্রথাগত বিষয়ভিত্তিক সীমানা ভেঙে দেয়। এটি প্রকল্পভিত্তিক ও আন্তঃশাস্ত্রীয় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তব বিশ্বের সমস্যা সমাধানে উৎসাহিত করে। রূপান্তরিত শিক্ষা-ব্যবস্থায় প্রযুক্তি শিক্ষার সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির মতো প্রযুক্তি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত শেখার চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে এবং শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও গাইডেন্স প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে—সম্প্রদায়, জাদুঘর এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে শিক্ষার নতুন ক্ষেত্র।
আমাদের শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে এমন নাগরিক তৈরি করা—যারা শুধুমাত্র জ্ঞানীই হবে না, বরং সুস্থ ব্যক্তিত্ব, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক দায়বদ্ধতায় পরিপূর্ণ হবে। তারা চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে, এবং সহানুভূতি, প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার সাথে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে।
আমি নিজে শিক্ষাবিদ নই। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ সময় জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার সুবাদে শিক্ষা নিয়ে সামান্য জ্ঞান ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা ও মতামত দেওয়ার চেষ্টা করছি—যার সাথে হয়তো অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে। সবিনয়ে সেই দ্বিমতের প্রতিও আমার শ্রদ্ধা থাকবে।
শিক্ষার মূল উপকরণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—জ্ঞান, নৈতিকতা, দক্ষতা ও জীবিকা। শিক্ষার সাথে দক্ষতা ও জীবিকার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। যুগের পরিবর্তনে মানুষের পেশার ধরণ পাল্টে যায়; ফলে শিক্ষা ও দক্ষতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন জরুরি।
শিক্ষার মাধ্যমে আমরা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করি—বিভিন্ন ধর্মতত্ত্ব, সামাজিক বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন ও মানবিক বিজ্ঞানের তত্ত্বের বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজকে দিকনির্দেশনা দেওয়াই শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য।
শিক্ষার আরেকটি উদ্দেশ্য হলো নৈতিক মানুষ তৈরি করা। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বৈশ্বিক নৈতিক মানদণ্ডের আলোকে শিক্ষাকে সাজানো জরুরি। শিক্ষার সাথে জীবিকার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও শুধু জীবিকার জন্য শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত নয়, তবুও প্রথমে জীবিকা—কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে নৈতিকতার বার্তা তেমন কার্যকর হয় না। ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য, সন্ত্রাস ও সহিংসতার অন্যতম কারণ। তাই শিক্ষাকে জীবিকা-নির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক হতে হবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিজ্ঞানহীন মানুষকে আজ মূর্খই বলা যায়। পূর্বের তিনটি শিল্প বিপ্লবের সুফল আমরা নিতে পারিনি; তাই এই বিপ্লবের সুযোগ কাজে লাগানোই হবে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। অটোমেশনের কারণে শুধু একটি বাটনে চাপ দিয়ে শত মানুষের দৈহিক শ্রমের কাজ সেকেন্ডেই করা সম্ভব। রোবট অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চেয়েও দক্ষ ও নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারে। থ্রি-ডি প্রিন্টিং, স্মার্টফোন, চালকবিহীন ড্রোন, চালকবিহীন গাড়ি, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), ব্লক চেইন, বিগ ডেটা প্রভৃতি প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
আশার কথা—চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পেশা সৃষ্টি হবে। সুতরাং জীবিকা নিশ্চিতে প্রযুক্তি-নির্ভর দক্ষতা অর্জনই আমাদের শিক্ষার অন্যতম প্রাধিকার হওয়া উচিত। দক্ষতাই হবে একমাত্র বিকল্প।
কিন্ত প্রশ্ন হলো—চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অসংখ্য সংকট বিরাজ করছে-
দক্ষ জনবলের অভাব
দূরদর্শী শিক্ষাদর্শনের অভাব
এক. গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি অযৌক্তিক ভয়: যদিও আমাদের প্রতিদিনের জীবনে বিজ্ঞান রয়েছে—
যেমন: সাঁতার কাটার সময় আমরা নিউটনের গতি-সূত্র অনুসরণ করি; পিছনের দিকে পানি ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। হাঁটাচলা থেকে দৈনন্দিন কাজ—সবই গণিত ও বিজ্ঞানের নীতির প্রয়োগ।
অথচ আমাদের দেশে একটি বড় অংশ মনে করে—বিজ্ঞান খুব কঠিন। কারণ অনেক শিক্ষক গণিত ও বিজ্ঞানকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বিষয় নয়। ফলে প্রাইভেট কোচিং ছাড়া বিজ্ঞান শেখা যায় না—এমন ধারণা তৈরি হয়। প্রাইভেট পড়ানোকে ব্যবসায়ে রুপান্তর করা—আমাদের বড় দুর্বলতা।
পাঠ্যবইয়ে পর্যাপ্ত উদাহরণ ও অনুশীলনের অভাবও গাইড বই নির্ভরতা বাড়ায়।
দুই. মানসম্মত শিক্ষক সংকট:
আরেকটি সমালোচনা হলো—
আমরা শিক্ষকতাকে বেকারদের পুনর্বাসন কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছি।
অনেকেই কোন চাকরি না পেয়ে সর্বশেষ পেশা হিসেবে শিক্ষকতা বেছে নেয়—ভালোবেসে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা কিছুটা ব্যতিক্রম।
আমরা জব মার্কেট এনালাইসিস না করেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি—
এদের বেশিরভাগের একমাত্র আশ্রয় সরকারি চাকরি।
কিন্তু দেশে সরকারি চাকরি রয়েছে মাত্র প্রায় ২০ লাখ
এবং প্রতি বছর পদশূন্য হয় মাত্র দেড় থেকে ২ লাখ।
অন্যদিকে, শুধুমাত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে ২৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী—
যারা প্রায় সবাই সাধারণ ধারার শিক্ষায়, কোন না কোন বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স করছে।
রাষ্ট্র কি তাদের কর্মসংস্থানের কথা ভেবেছে? আমার মনে হয় না এই দিকে পর্যাপ্ত নজর দেয়া হচ্ছে।
যদি এই সব শিক্ষার্থীদের জীবনঘনিষ্ঠ টেকনিক্যাল শিক্ষা দেয়া যেতো
তাহলে দেশে-বিদেশে ইনকাম জেনারেটিং কর্মে যুক্ত হতে পারতো। পাশাপাশি কাঙ্খিত চাকরি না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজের কর্মসংস্থানের চেষ্টা করতে গিয়ে আবার নতুন করে সাধারন ধারার স্কুল-কলেজ খুলছে।
ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে—
এভাবে আমরা শিক্ষাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে রূপান্তর করেছি।
ফল—বেকারত্বের দুষ্টচক্র।
শিক্ষকতা পেশাকেও আমরা আকর্ষণীয় করতে পারছি না।
ইনকাম কম হওয়ায় সামাজিক মর্যাদাও কম—
যার ফলে শিক্ষকরা হতাশ হয়,
আর হতাশ শিক্ষক দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা সম্ভব নয়।
তিন. শিক্ষাদানের পদ্ধতিগত দুর্বলতা: আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিযোগিতামূলক—
শিক্ষার্থীরা সহপাঠীকে সহযোগী নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে।
এ প্রতিযোগিতা অনেক সময় শত্রুতার পর্যায়ে গড়ায়।
জাতীয় জীবনে এর নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সমমর্মিতা তৈরি করতে হলে প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বের হয়ে সহযোগিতামূলক শিক্ষা পদ্ধতিতে আসতে হবে। এই জন্যে দক্ষতামূলক শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করা উচিত। তাই এসাইনম্যান্ট, গ্রুপ ওয়ার্ক ও ফিল্ড ভিজিট প্রভৃতি পদ্ধতির মাঝে শিক্ষা দেয়া উচিত।
সুতরাং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন।
চার. আমাদের শিক্ষা মুখস্থনির্ভর—
মুখস্থ করা ও নকল করার মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। নকল করা মানে অন্য কোন ডিভাইসে কনটেন্ট কপি করে তা দেখে হুবহু লেখা অন্যদিকে মূখস্ত করাও তাই। ব্রেইনে কপি করে হুবহু লিখে দিয়ে আসা হয়।
পাচ. আমাদের শিক্ষা ডিমান্ড-ড্রিভেন নয়।
মার্কেটে চাহিদা বেশি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষ manpower-এর
কিন্তু আমরা তৈরি করছি বেশি কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান গ্র্যাজুয়েট—
এটি বড় mismatch।
ছয়. আরেকটি সমস্যা—
পাঠ্যবই প্রণেতাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন—" সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায়না বলা সহজে।"
সত্যিই সহজ করে বলতে পারা আসলেই একটি কঠিন কাজ। অনেক সময় মাধ্যমিক বই প্রণয়নে মাধ্যমিক শিক্ষকদের রাখা হয় না;
প্রাথমিকের বই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দিয়ে লেখা হয়,
ফলে ভাষা জটিল হয়—যা শিশুদের উপযোগী নয়।
সাত. দক্ষ, স্মার্ট ও শ্রম বাজারের উপযোগী স্নাতকদের মাঝে Soft Skills থাকা জরুরি, যেমন: যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা করার দক্ষতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা।
দুঃখজনকভাবে—আমাদের শিক্ষায় এখনো এগুলো নিশ্চিত করতে পারছে না।
সর্বোপরি,
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক সময় “ভালো শিক্ষার্থী” তৈরি হলেও
“ভালো মানুষ” তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে—
যার প্রতিফলন আমরা জাতীয় জীবনে দেখি।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে নৈতিক ও দক্ষতা-নির্ভর প্রযুক্তি শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চশিক্ষা হতে হবে জ্ঞান সৃজনের জন্য। সবাইকে উচ্চশিক্ষায় আনাটা প্রয়োজনীয় নয়, বরং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিই হবে অগ্রাধিকারের অগ্রাধিকার।