14/04/2023
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রস্তাব (October, 2022)
জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট যেটি বিদ্যমান পৃথিবীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক শৃঙ্খলাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিতে সক্ষম। জলবায়ু সংকটের শিকার পৃথিবীর অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হল বাংলাদেশ যার ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের অন্যতম মূল নিয়ামক হবে এই জলবায়ু পরিবর্তন৷ ইতোমধ্যেই প্রাকৃতিক দূর্যোগ, উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট, কৃষিকাজে ব্যাপক পরিবর্তন সহ বিভিন্ন প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে, কপের ২৭ তম সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যুগে যুগে বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ- দেশের প্রগতির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবসময়ই দূর্যোগের মুহুর্তে দেশের হাল ধরেছে। তাই, অনিবার্য এই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, যার প্রমাণ কপ ২৭ কে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তৈরী করা এই প্রস্তাবসমূহ। বিগত দুই মাস ধরে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ভাবে বিভিন্ন আলোচনার প্রেক্ষিতে করা প্রস্তাবের চূড়ান্ত রূপ নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ-
১. জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্থানীয় প্রতিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির ওপর জোর দেয়া
দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল যে, এটি জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় ব্যয়বহুল। কিন্তু সাম্প্রতিক ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো আমাদের দেখিয়ে দেয়, বর্তমান সময়টাই জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর সবচেয়ে আদর্শ সময়। তাই, কপ ২৭ এ বাংলাদেশের প্রত্যাশা, বাংলাদেশের মত দেশগুলোর পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে এবং কোনো অধিবাসীর জীবন জীবিকার ক্ষতি না করে যেন নবায়নযোগ্য ও টেকসই জ্বালানি উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
২. সাংস্কৃতিক ও সামাজিক নিয়ামকগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে জলবায়ু সুবিচার নিশ্চিত করা
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে প্রায় ১০ মিলিয়ন জলবায়ু অভিবাসীর সৃষ্টি হয়েছে এবং এই সংখ্যাটি ক্রমবর্ধমান। এই বিশাল সংখ্যক মানুষ তাদের জীবিকা এবং ভূমি হারিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে বিভিন্ন শহরমুখী হচ্ছে। এসব ছিন্নমূল মানুষদের দূর্ভোগের জন্য উন্নত বিশ্বের দেশগুলো দায়ী, যারা পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বেশী কার্বন নিঃসরণ করে। ফলে, কপ ২৭ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু সুবিচার যেন নিছকই প্রকল্প নির্ভর ও সাময়িক না হয়। বরং স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতিকে বিশ্লেষণ করে টেকসই পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সকল উদ্যোগে নারীর সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নের দিকে মনোযোগ দেয়া
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের নারীদের বিদ্যমান পশ্চাৎপদ অবস্থাকে আরো জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃত্ব, ক্ষমতায়ন ইত্যাদি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানির ও জীবিকার সন্ধানে স্থানান্তরিত পরিবারের নারীরা বিভিন্ন যৌন হয়রানি ও হেনস্তার শিকার হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার পরিবারগুলোতে কমছে নারী শিক্ষার হার, বৃদ্ধি পাচ্ছে বাল্যবিবাহ। সেই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন নারীর সমতার সংগ্রামকে বাধাগ্রস্থ করছে। তাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সকল পদক্ষেপে নারীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৪. ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বনভূমি ও বৃক্ষ সংরক্ষণ
পৃথিবীব্যাপিই বনভূমিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে এবং নিজেদের তাগিদেই বনকে সংরক্ষণ করছে। অথচ, বিগত দশকগুলোতে অপরিকল্পিত বিভিন্ন প্রকল্প এসব নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাকে বন রক্ষার নামে ধ্বংস করে দিলেও বনভূমি রক্ষায় কাজে আসছে না। বরং সরকারের বিভিন্ন অংশের দূর্নীতি এসব বনকে ধ্বংস করছে। অন্য দিকে, যদি বন রক্ষায় এসব নৃগোষ্ঠীর জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যেত, তবে সেটি বনভূমি সংরক্ষণে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারতো। তাই,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বন রক্ষায় প্রত্যক্ষভাবে নৃগোষ্ঠীকে যুক্ত করতে চায় এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চলের যে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবহার যেমন রিসোর্ট বা হোটেল তৈরী বন্ধে কঠোর বিধিমালা দাবী করে।
৫. জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সকল পরিকল্পনায় স্থানীয় জ্ঞানের ব্যবহার এবং ভুক্তভোগী সংজ্ঞায়নে স্থানীয় চিহ্নিতকরণ
বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থেকেছে এবং জীবিকা থেকে কৃষি উদ্ভাবনে সবসময়ই বিরূপ পরিস্থিতিকে জয় করেছে। বর্তমান সময়ে বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপটে এসব স্থানীয় প্রজ্ঞা ও জ্ঞানকে অবহেলা করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি, জলবায়ু সুবিচার নিশ্চিতকল্পে ভুক্তভোগী বা ভিকটিমের সংজ্ঞায়ন গুরুত্বপূর্ণ এবং এলাকাভেদে ভিকটিমের বৈশিষ্ট্যও ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করে, স্থানীয় জ্ঞানের ব্যবহার এবং ভিকটিম চিহ্নিতকরণে স্থানীয় বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৬. মৌলিক মানবাধিকারের মত মৌলিক জলবায়ুঅধিকার প্রণয়ন
১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র পৃথিবীর মানুষের জন্য ছিল মুক্তির সনদ। অন্ততঃ, রেফারেন্স হিসেবে হলেও এই ঘোষণাপত্রটি নিপীড়িত মানুষদের মুক্তির পথ দেখিয়েছে, নিপীড়িকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা যুগিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের মত দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় কপ ২৭ এর কাছে মৌলিক জলবায়ুঅধিকার প্রণয়ণের উদ্যোগ নেবার দাবী জানায় যেখানে একজন মানুষ হিসেবে জলবায়ু,পরিবেশ ও প্রতিবেশ নিয়ে যেসব মৌলিক অধিকার রয়েছে, তা সন্নিবেশিত হবে।
৭. জলবায়ু শরণার্থী এবং গণহত্যার মত প্রতিবেশের পরিকল্পিত ধ্বংসকে 'ইকোসাইড' হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
জলবায়ু শরণার্থী তথা জলবায়ু পরিবর্তনের স্বীকার হয়ে অন্য দেশে গমনের ঘটনা বর্তমানে ঘটছে কিন্তু স্বীকৃতির অভাবে সেটি মূলধারার পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। পাশাপাশি, বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে শিল্প কারখানা ও বাণিজ্যিক স্বার্থে পরিকল্পিতভাবে অগণিত প্রতিবেশকে ধ্বংস করা হয়েছে, জলাশয়-জলাভূমি ও বনাঞ্চলকে বিলীন করা হয়েছে। গণহত্যার মত এগুলোও মানবতাবিরোধী অপরাধ যার ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে জলবায়ুতে এবং অগণিত মানুষ সেটির কুফল ভোগ করছে। তাই, জলবায়ু শরণার্থী এবং ইকোসাইড এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।
৮. জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত তথ্য, পরিসংখ্যান ও জরিপের ফলাফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
জলবায়ু পরিবর্তন, এর ভুক্তভোগী এবং ফলাফল বুঝতে হলে সঠিক তথ্যপ্রবাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ, দূর্ভাগ্যের বিষয় যে, অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এসব তথ্য ও সংখ্যাকে প্রভাবিত করা হয়, মিথ্যা তথ্য ও ডেটা দিয়া রাজনৈতিক জনমত তৈরী করা হয়। ফলে, প্রকৃত তথ্যের অভাবে ভুল চিত্র ফুটে ওঠে এবং সেজন্য প্রকৃত পরিস্থিতি নীতিনির্ধারণে উঠে আসে না। তাই, কপ ২৭ এ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত তথ্য, পরিসংখ্যান ও জরিপের ফলাফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে।
৯. দূষণকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সরকারকে শক্তিশালী করা
পরিবেশ দূষণ আইন প্রায় সকল দেশেই কাগজে-কলমে কার্যকর থাকলেও তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না বললেই চলে। বিশেষ করে, নব্য উদারবাদী বিশ্বকাঠামোর মাঝে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে কাঠগড়ায় দাঁড়া করানোটা উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর জন্য কঠিন কাজ। এবং এসব অসীম ক্ষমতাধর বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই রাষ্ট্রকাঠামোর ফাঁক ফোকর দিয়ে জবাবদিহিতা ব্যতিতই দায়মুক্ত হয়। তাই, এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সরকারকে শক্তিশালী করা কপ ২৭ সম্মেলনে প্রস্তাবিত হল।
Compiled and Prepared by: Dhaka University for Climate Action (DUCA)