03/04/2023
★★ দুর্বল ও হতাশ ছাত্র গড়ে তোলার গল্প-১ ★★
*নাম, আম্মার আব্দুল্লাহ
*পিতা,মাও.আব্দুল্লাহ আর মাজেদ
মদিনা প্রবাসী , সাবেক শিক্ষক, ফরিদাবাদ মাদরাসা ঢাকা। (তিনি আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রহ.এর খাদেম ছিলেন) *বাসা, সাইনবোর্ড,ঢাকা।
ছেলেটি গতবছর রমজানের পর আমাদের মাদরাসায় আসে। ঢাকার বিভিন্ন মাদরাসায় তিন বছরে ১৪ পারা পড়েছে। ৩ বছর পড়ানোর পর ঢাকার হুজুররা তার বাবাকে জানিয়ে দিল সে হিফজ পড়তে পারবে না।
এমতাবস্থায় তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে আমার সাথে যোগাযোগ করে পুর্ণ হালত বর্ণনা করেন।
আমি ওনাকে বললাম, আপনার ছেলেকে আমার কাছে পাঠান, আমি তার সাথে কথা বলে হালত জানার চেষ্টা করি।
তাকে তার বড় ভাইয়ের সাথে পাঠালো।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কয় পৃষ্ঠা করে সবক শোনাতে পারো? সে বলল, ১পৃষ্ঠা।
তাহলে তো ৩ বছরে তোমার হিফজ শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। কারণ ১২পারা পড়তে সময় লাগে ২৪০ দিন। ২৪০ দিনে ৮ মাস। যদি কেউ বছরের আট মাস এক পৃষ্ঠা করে ছবক দেয়, দুই বছরের ২৪ পারা হবে। আড়াই বছরে পুর্ণ হিফজ শেষ হয়ে যাবে।
সে কোন জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।
আবার জিজ্ঞেস করলাম,আমুখতা (পিছনের পড়া) কতটুকু করে শোনাতে? জবাব, ১০ পৃষ্ঠা।
পিছনের পড়া সব ইয়াদ আছে?
জবাব, না।
কয় পারা ইয়াদ আছে? কোন জবাব নেই।
তুমি কি হিফজ শেষ করতে পারবে?
সহজে স্বীকারোক্তি, না।
এটা কি তুমি নিজ থেকে বলেছ? নাকি অন্য কেউ বলেছে?
অনেক সময় চলে গেলেও কোন জবাব দিচ্ছেনা।
অনেক পীড়াপীড়ির পর বলল,হুজূররা বলে পারবোনা।
এরপর আমি সাদুদ্দীন তাফতাতানী রহ.সহ অনেক মনীষীদের গল্প শুনালাম। সাথে তার বাবার মনের আশা পূরণ করে দেখিয়ে দিতে বললাম। আরো বললাম, তোমার বাবা মদিনায় থাকে। রসুল সা. এর রওজার পাশে বসে তোমার জন্য দোয়া করলে তুমি অবশ্যই হিফজ পড়তে পারবে ইনশাআল্লাহ।
এরপর বললাম,বল!
ইনশাআল্লাহ আমি হিফজ শেষ করবই!
মিনমিনিয়ে বলল,জী ইনশাআল্লাহ।
আমি বললাম,মাথা উঁচু করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে জোরে বলো, ইনশাআল্লাহ আমি হিফজ শেষ করব।
এবার সে মাথা উঁচু করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল ইনশাল্লাহ আমি হিফজ শেষ করব।
এবার তার চোখে মুখে দৃঢ়তা দেখতে পেলাম।
এরপর তাকে ভর্তি করালাম।
এখন আমার মিশন হল তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। প্রতিনিয়তই তাকে বিভিন্ন সফল মনীষীদের গল্প শোনাচ্ছি। আশা-জাগানিয়া বাণী দিয়ে তার ব্রেনকে ওয়াশ করে ফেলার চেষ্টা। এভাবে ১০-১৫ দিন কেটে গেল। এবার পড়াশোনা শুরু করার পালা।
তবে দুঃখজনক কথা হলো,পিছনের সব পড়া সে ভুলে গেছে। এমনকি আমপারাটাও তার ইয়াদ নেই।
শুরু হলো নতুন করে সবক পড়া। আমপাড়া শেষ করতে লেগে গেল দশ দিন। এভাবে ১পৃষ্ঠা, দেড় পৃষ্ঠা, ২ পৃষ্ঠা, যখন যেমন পারে নতুন করে সবক পড়তে লাগলো। হাটি হাটি পা পা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নম্র ভদ্র আলেম ফ্যামিলির এই ছেলেটি এখন পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী। আসরের পরে যখন খেলাধুলার ছুটি দেই, সে পর্দার আড়ালে কোরআন শরীফ নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এই হতাশ ছাত্রটির এমন আগ্রহ দেখে রবের কৃতজ্ঞতায় চোখে পানি চলে আসে। তার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করেছি।
গত এক বছরে ১৬ পারা হিফজ করেছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী রোজার আগেই সে পূর্ণ কোরানুল কারীম হিফজ করে ফেলবে ইনশাআল্লাহ।
তবে আফসোস! তার পুরো ফ্যামিলি মদিনাতে চলে যাওয়ায় সে আর থাকতে পারলো না। রোজার আগেই চলে গেল। ঐ মূহুর্তে আমার বুক ফেটে কান্না আসছিল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। বহু কষ্টে হাসি মুখে বিদায় দিলাম। ছেলেটিকে খুবই ভালোবাসায়।তাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হিফজ শেষ করলেই বিদায় দিয়ে দিব। কারণ এদিকে তার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। ঢাকা থেকে তার মা আসা-যাওয়া করতে পারে না। একাই ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা থেকে আসা-যাওয়া করতে হয়। কিন্তু....
আমার আশা, আশায় থেকে গেল....
দোয়া করি বাবা তুমি যেখানেই থেকো, ভালো থেকো,সুস্থ থেকো। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো। তোমার এই নগণ্য ওস্তাদের মনের আশাটা তুমি পুরা করো।
আল্লাহ যেন হাশরের কঠিন মুসিবতে তোমার উসিলায় এই পাপিষ্ঠকে মাফ করেন-আমীন।