07/07/2023
💔গল্প:- বেলাশেষে 💔💔
🌹🌹 পর্ব:- পর্ব:- তিন এবং শেষ পর্ব 🌹🌹
সাদিয়া বাড়ির বাকি সব রুমগুলোতেও খুঁজলো তবুও কোথাও কারো দেখা মিললো না। মুনতাশা এখনো ঘোর থেকে বের হতে পারছে না। কি থেকে কি হলো? ইরানি ইনায়াতের বোন অথচ তিনবছরের সংসার জীবনে কখনো এ কথা শোনেইনি ইনায়াতের মুখ থেকে।
মুনতাশার শ্বাশুড়ি প্রায়ই তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো তবে কেন কাঁদতো সেটা মুনতাশা জানতো না। আজ বুঝেছে তার শ্বাশুড়ি নিজের মেয়ের কথা মনে করেই তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো। কিন্তু ইরানি কোথায়?
নিশি, মুনতাসির আর নাবহান মিলে পুরো ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজছে যদি কোনো ক্লু পায় কিন্তু না,বারে বারে তারা হতাশ হচ্ছে। কোথাও কিছু নেই। কোথায় খুজবে এখন তাদের বাবাকে।
টেবিলের উপরে এক কোনায় সাদিয়ার প্রেগন্যান্সির একটা কাগজ ছিলো। হঠাৎ সেখানে চোখ যাওয়ায় সাদিয়া পেটে হাত দিয়ে গুমড়ে কেঁদে ওঠে। সাদিয়ার কান্নার শব্দে এগিয়ে আসে মুনতাশা আর তারপর নিশি। মুনতাশা উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করে,
-"কাঁদছো কেন ভাবি? কি হয়েছে?"
-"তাশা ,তাশা তোমার সাথে করা অন্যায়ের শাস্তি আমার মাসুম বাচ্চাটা কেন পেলো বলতে পারো? ও তো দুনিয়ার আলো ও দেখেনি। কেন হলো ওর সাথে এমন?"
উপস্থিত সবাই সাদিয়ার কথায় হতভম্ব। কেউই কিছু বুঝতে পারছে না। কিসের শাস্তি,কি শাস্তি কিছুই বুঝতে না পেরে নিশি বললো,
-"ভাবি কি বলছো তুমি? তোমার বাচ্চা কিসের শাস্তি পেয়েছে?আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না । বুঝিয়ে বলো প্লিজ।"
-"আমার বাচ্চাটা আর নেই, নিশি। আমার পাপের শাস্তি ও পেয়েছে। এই নষ্ট শহরে আসার আগেই চলে গেছে। ও মারা যাওয়ায় ইনায়াতও আমাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছি।"
সাদিয়ার কথা শুনে সবার দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। প্রকৃতি হয়তো এভাবেই প্রতিশোধ নেয়। পাপ করে পাপী কখনোই ছাড় পায় না। তার পাপের সাজা তাকে ভোগ করতেই হয়।
হঠাৎই নাবহানের দৃষ্টি পড়লো ঘরের এক কোনায় রাখা একটি মাঝারি সাইজের বাক্সের দিকে। বাক্সটিতে বেশ ধুলো জমেছে। বাক্সের সামনে মুখোমুখি ভাবে একটি চেয়ার রাখা। দেখে মনে হচ্ছে এই চেয়ারে বসে কেউ এই বাক্সের দিকেই তাকিয়ে থাকে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো বাক্সটিতে ধুলো ময়লা থাকলেও চেয়ারটি একদমই পরিষ্কার। দেখেই বোঝা যাচ্ছে চেয়ারটিতে নিয়মিত কেউ বসে বা নিয়মিত এটি ব্যবহার করা হয়।
নাবহান বাক্সটির কাছে গিয়ে দেখলো সেটি তালাবদ্ধ। মুনতাসির তল্লাশি চালিয়ে একটা লোহার দন্ড পেলো। সেটা দিয়ে তিন-চারটা আঘাত করাতেই তালা ভেঙে গেলো। ততক্ষণে সাদিয়া,মুনতাশা ,নিশি সবাই সেখানে চলে এসেছে।
বাক্সটি খুলতেই কেমন একটা বিশ্রী গন্ধ বের হলো। অনেক বছর কিছু আটকা থাকলে যেমন গন্ধ বের হয় তেমন। নাবহান বাক্সের ভিতরে হাতড়ে একটা একটা করে জিনিস বের করে ফ্লোরে রাখছে। এক একটা জিনিস দেখে সকলের হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়ছে একটু একটু করে।
একদম শেষে বের হলো একটি দড়ি। বেশ মোটা ধরনের দড়ি। কেউ গলায় ফাঁস দিলে যেভাবে বাঁধা থাকে ঠিক সেভাবেই বাঁধা দড়িটা। মাথা ঢোকানোর গোল অংশটা কালচে হয়ে আছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে কেউ এই দড়িটা দিয়ে গলায় দড়ি দিয়েছিলো।
সকলেই বেশ ভয়ার্ত চোখে চেয়ে আছে। তবে মুনতাশা আর নিশির চোখে একঝাঁক বিষ্ময় কারন এখানে অন্যান্য জিনিসের সাথে ইরানিকে তার জন্মদিনে তারা যেসব গিফট দিয়েছিলো সেগুলোও আছে। তার মানে এই বক্সে যা আছে সব ইরানির? তাহলে এই দড়ি?
ভাবতেই আঁতকে উঠলো দুজন। বিষ্ময় কেটে গিয়ে মূহুর্তেই তাদের দুচোখে জমা হলো ভয়।
প্রতিটা জিনিসের উপর কালচে দাগ। বহুদিন কোথাও রক্ত লেগে থাকলে শুকিয়ে যেমন হয় তেমন রং। সমস্ত জিনিসের মধ্যে একটি টেডিবিয়ার ও ছিলো যেটার চোখমুখে টেনেটুনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। টেডিটার সারা গায়ে রক্তের দাগ। এটা দেখে স্তব্ধ নাবহান সাথে মুনতাশা আর নিশিও। এই টেডিবিয়ারটা নাবহান ইরানিকে তার জন্মদিনে দিয়েছিলো শালী হিসেবে। সেদিন ইরানির চোখেমুখে কি প্রাণবন্ত হাঁসি ছিলো।
-"ওটা তোর দেওয়া ডায়েরিটা না, তাশা?"
নিশির আঙ্গুলের ইশারায় সেদিকে তাকালো মুনতাশা। নাবহান টেডিটা পাশে রেখে তুলে নিলো সেই ডায়েরিটা। ডায়েরিটা লক সিস্টেম। এতদিন পর কি লক কাজ করবে? করলেও তারা তো লক জানেনা। মুনতাশা বললো ,
-"'ERANI' লিখে দেখো তো।"
নাবহান সেটা লিখে চেষ্টা করলো কিন্তু কাজ হলো না। মুনতাশা আবার কিছু সময় ভাবলো। তারপর ক্ষীণ কন্ঠে বললো,
-"'Erani Loves Nabhan' এটা চেষ্টা করো।"
মুনতাশার কথায় নাবহান ব্যতীত সকলেই চমকে উঠলো।নিশি তো ছিটকে দু'পা পেছনে চলে গেলো। চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
-"হোয়াট? কি যা তা বলছিস তাশা? ইরানি, জিজু ... লাভ। পাগল হয়ে গেছিস তুই? "
মুনতাশা উত্তর দিলো না। শান্ত চোখে চেয়ে শুকনো হাসি দিলো। নাবহান সেটা লিখে চেষ্টা করলেও কাজ হলো না।
-"নাবহান ,ডায়েরিটার পেছনে মে বি কিছু একটা আছে?"
মুনতাসির সামনে কিছুটা ঝুঁকে বললো।
নাবহান ডায়েরিটা উল্টাতেই চোখে পড়লো হালকা গোলাপি একটা রঙিন কাগজ যেটা আঠা দিয়ে ডায়েরির পেছনে লাগানো। কাগজের এককোনা কিছুটা উঠে এসেছে তাই সেটা মুনতাসিরের চোখে পড়েছে। কাগজের উপর গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,
-" NABHAN hates ME."
লেখাটা যে ইরানির সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই নিশি এবং মুনতাশার। ইরানির এই লেখাটি দেখে অবাক হলো সবাই। নিশি তড়িঘড়ি করে নাবহানের উদ্দেশ্য বললো,
-"জিজু এটা পাসওয়ার্ড হিসেবে ট্রাই করুন।"
নাবহান চেষ্টা করতেই ডায়েরিটা খুলে গেলো। ডায়েরিটা খুলতেই নাবহানের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। তার কিছু মনে পড়ছে। তার মনে পড়ছে সে ইরানিকে বলেছিলো যে সে ইরানিকে ঘৃনা করে।
মুনতাসির নাবহানের হাত থেকে ডায়েরিটা নিয়ে নিলো। প্রথম পাতা উল্টাতেই চমকে উঠলো। সেখানে নাবহান আর মুনতাশার ছবি আঠা দিয়ে লাগানো। চমকানোর কারন এটা নয় যে সেখানে তাদের দুজনের ছবি আছে, চমকানোর কারন এটা যে তাদের দুজনের ছবির উপর বেশ কিছু ক্রস চিহ্ন দেওয়া।
মুনাতাশা এটা দেখে বেশ ঘাবড়ে গেলো। নাবহানকে শক্ত করে ধরে বসলো সেখানে।
পরবর্তী পাতা উল্টাতেই দেখলো সেখানে লেখা,
-"প্রিয় বান্ধবী, ট্যাশা। তোর দেওয়া ডায়েরিটা তোর ভালোবাসাকে উৎসর্গ করলাম।"
মুনতাশা হতবাক। এটা তার ভালোবাসা মানে নাবহানকে উৎসর্গ করেছে ইরানি?
পরের পাতায় লেখা,
-"ডায়েরিটা যার হাতেই পড়ুক দয়া করে এটা নাবহানকে একবার পড়তে বলবে।"
এটুকু পড়তেই মুনতাসিরের দিকে তাকালো নাবহান। ডায়েরিটা নিয়ে নিলো মুনতাসিরের হাত থেকে। কাঁপা হাতে পরের পৃষ্ঠা উল্টালো।
-"প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম চরের হাঁটে। নদীতে কি সুন্দর করে সাঁতার কাটছিলে তুমি। আমি মুগ্ধ নয়নে দেখছিলাম। তোমাকে ঠিক ওই মূহুর্তেই ভালো লেগেছিলো আমার। হয়তো ভালোবাসার শুরুও সেখানে।
আমার মতো মুনতাশার চোখেও ওই একই দিনে,একই সময়ে ধরা দিয়েছিলে তুমি। আমি দেখেছিলাম মুনতাশাও তোমার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। মুনতাশাও হয়তো দেখেছিলো আমার দৃষ্টি।
জানো নাবহান,সেদিনের পর আমার শয়নে স্বপনে শুধু তুমিই ছিলে। তবে তোমার সামনে গিয়ে ভালোবাসার কথা বলার সাহস ছিলো না আমার।
আমি বরাবরই ছেলে মানুষের সাথে কথা কম বলি।আসলে বলতে ভয় লাগে আমার। ছোট বেলায় বাবা মারা যায়। মা আমাকে আর ভাইয়াকে নিয়ে চলে আসে গ্রামে। তখন আমার বয়স পাঁচ কি ছয় বছর। ভাইয়াকে পড়াশোনার জন্য আমেরিকায় মামার কাছে পাঠিয়ে দেয়। আমার একমাত্র সঙ্গী ছিলো আমার ভাই।আমি ইনু ভাই বলতে পাগল ছিলাম। আমার সেই ভাইটা আমাকে ছেড়ে চলে গেলো।
প্রথম প্রথম ভাইয়ার সাথে ফোনে কথা বলতাম। কিন্তু যত দিন গেলো তত ভাইয়া পড়াশোনার চাপে আমাকে ফোন করা কমিয়ে দিলো। আমার অভিমান জমে জমে এক পাহাড়ে পরিনত হলো। এরপর ভাইয়া ফোন করলেও আমি কথা বলতাম না। কাউকে কখনো বলতামও না যে আমার একটা ভাই আছে। ইনু ভাইয়াকে আমি আমার মনের মধ্যেই আটকে ফেললাম। বাইরের জগতে কোথাও তাকে রাখলাম না। এমন ভাইকে দিয়ে কি করবো যে তার একটা মাত্র বোনের খোঁজ ও নেয় না।
পরে মা অবশ্য বলেছিলো যে তার থেকে ভাইয়া নিয়মিত আমার খোঁজখবর নেয়। তবুও আমার অভিমান ছাপিয়ে ভাইয়ার সাথে কথা বলতে যাইনি কখনো।
যেখানে নিজের বাপ-ভাই আমাকে এভাবে ফেলে গেলো সেখানে অন্য ছেলেকে কিকরে সহজভাবে নিবো বলো? তাই তো ছেলেদের থেকে দূরে দূরে থাকতাম।
আমি কিছুদিনের জন্য হোস্টেল থেকে মায়ের কাছে গ্রামে গেছিলাম। আমাদের শহরের বাড়িটা কাছে থাকলেও আমরা সেখানে থাকতাম না। মা একা একা ও বাড়িতে থাকতে পছন্দ করতো না।তাই সে গ্রামে থাকতো। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে মায়ের কাছে গিয়ে চারদিন থেকে এলাম।
গ্রাম থেকে যেদিন ফিরলাম তারপর দিন ক্লাসে যাওয়ার পথে দেখলাম তুমি আর তাশা হাত ধরাধরি করে হাঁটছো। বিশ্বাস করো এক মূহুর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলাম আমি। দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছিলো। আমার মনের মধ্যে যে কি চলছিলো সেটা কাউকে বোঝানোর ভাষা জানা নেই আমার।
চোখের পানিও বাঁধ ভেঙেছে তখন। টপটপ করে পানি পরছিলো চোখ দিয়ে। তখনই এক রুমমেট এসে বললো, "ইরা কাঁদছিস কেন?"
ওর কথাতে আমার সম্বিত ফিরলো। কতজন আড়চোখে তাকিয়ে ছিলো আমার দিকে। আমি কোনোমতে 'কিছুনা' বলে সেখান থেকে চলে গেলাম।
ক্লাসে নিশি এসে বললো তোমাদের সম্পর্ক দুদিন আগে শুরু হয়েছে। আমি মুচকি হাসলাম। তাশা ক্লাসে আসার পর ওকে কংগ্রেস জানালাম। আমি মন থেকে চাচ্ছিলাম তোমরা দুজন খুশি থাকো। আর তাশাতো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড,ওর খুশি কিভাবে কেড়ে নেই বলো?"
নাবহান এটুকু পড়তেই মুনতাশা শব্দ করে কেঁদে উঠলো। ও জানতো ইরানি নাবহানকে ভালোবাসে কিন্তু এতোটা ভালোবাসে সেটা জানতো না। নাবহানের চোখেও পানি। নিশি মুখ চেপে কাঁদছে। ও কখনো বুঝতেই পারেনি ইরানির মনে এতো কষ্ট জমা ছিলো।
নাবহান নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। মুনতাশা কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে ফেলেছে। নিশি জড়িয়ে ধরলো মুনতাশাকে। নাবহান আবার পড়া শুরু করলো,
-"আমি চেয়েছিলাম তোমাদের চোখের আড়ালে চলে যাবো কারন সামনে থাকলে তোমাদের দেখে আমার হিংসা হতো। মনটা বড় বেহায়া জানো তো। কিছুতেই আমার কথা শুনতে চাইতো না। ও বারবার তোমাকে চাইতো নাবহান কিন্তু তুমি যে নিষিদ্ধ আমার জন্য। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বরাবরই একটু বেশি থাকে। আমারও ছিলো।
সেদিন আমার জন্মদিনে তুমি আমাকে একটা টেডিবিয়ার দিয়েছিলে। তারপর ও থেকে আমি আবারও তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন সাজাতে শুরু করলাম। আমার মনে হতো তোমাকে একবার চাইলে হয়তো পাবো।আমি সারাদিন ওই টেডিবিয়ারটা আঁকড়ে ধরে বসে থাকতাম। ওটাতে তোমার ছোয়া পেতাম আমি। কেন দিয়েছিলে ওটা? ওটা দেখলেই তোমাকে পাওয়ার আশা জাগতো মনে। সেই আশাতেই বড় ভুলটা করে ফেলেছিলাম আমি।
সেদিন মুনতাশা ,নিশি কেউ কলেজে আসবে না বলেছিলো। আমি ভেবেছিলাম এটাই সুযোগ তোমার সাথে দেখা করার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। চলে গেলাম তোমার সাথে দেখা করতে। আমি শুধু তোমার কাছে ভালোবাসা চাইতে গিয়েছিলাম বিশ্বাস করো। তোমাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইনি। কিন্তু বেপরোয়া মনটা কিভাবে যেন মস্তিষ্ককে জানান দিলো, তোমাকে সে ছুঁতে চায়। আমি না চাইতেও জড়িয়ে ধরেছিলাম তোমায়।"
এটুকু পড়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো নাবহান। তার চোখে ফুটে উঠলো সেদিনের দৃশ্য। চকিতে চোখ মেলে তাকালো সে। মুনতাশা আর নিশির কান্না থেমে গেছে খানিক আগেই। এখন যা শুনছে সবটাই তাদের কাছে নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায়ের সূচনা তাদের অগোচরে হয়েছিলো। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নাবহানের দিকে।
নাবহান তাদের দৃষ্টি উপেক্ষা করে আবার ডায়েরির দিকে তাকালো। সে হয়তো জানে সামনে কি লেখা।তবুও কাঁপা কাঁপা গলায় আবার পড়তে শুরু করলো,
-"আমি কল্পনায়ও ভাবতে পারিনি তোমার চোখে এতটা নীচ হয়ে যাবো আমি। তোমার সেদিনের বলা প্রতিটি কথা আমার হৃদয়ে আঘাত করেছিলো। বিশ্বাস করো আমি ভাবতেই পারিনি তুমি আমাকে প্রস্টিটিউটের সাথে তুলনা করবে। আমি জানি তোমাকে জড়িয়ে ধরা অন্যায় ছিলো কিন্তু আমি তোমার বলা কথাগুলো মানতে পারিনি। আমার সেই কথাগুলো লিখতেও হাত কাঁপছে নাবহান। কিভাবে বলেছিলে তুমি সেগুলো?
সেদিনের পর থেকে প্রচন্ড হীনমন্যতায় ভুগতাম আমি। মা আমার জন্য শহরে চলে এলো। আমাকে নিয়ে আমাদের শহরের বাড়িটাতে উঠলো। আমাকে স্বাভাবিক করার অনেক চেষ্টা করেছে তবুও আমি ঠিক হতে পারিনি নাবহান। আমি ডিপ্রেশনে ডুবে গেলাম। আমি জানি নিশি আর তাশা আমাকে খুব ভালোবাসে।আমিও ওদের ভালোবাসি আর তোমাকেও।আমি ওদের থেকেও গুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে। ওরা আমার এই বাড়ির ঠিকানা জানতো না।আমি জানি ওরা কেউ আর কখনো পাবে না আমাকে।
আমার জন্য মা ভাইয়াকে ডাকলো। আমার অবস্থা শুনে ভাইয়া ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে বাংলাদেশ ফিরলো। কত বছর পর জানো? ১৭ বছর পর। ভাইয়ার ফেরার খবর শুনে আমার ডিপ্রেশনের পাশাপাশি অভিমানটাও তাজা হয়ে উঠলো। আজ কাউকে প্রয়োজন নেই আমার। আমার জীবনের প্রতিটি দিনের মতো শেষ দিনেও একা থাকতে চাই আমি।
তোমার দেওয়া অপমানের আঘাত নিয়ে বেঁচে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয় নাবহান। আমি এবার এ জীবন থেকে মুক্তি চাই। আমার কৃতকর্মের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। আমি এসবের কিছুই তাশাকে কখনো জানাইনি কারন ও কষ্ট পাবে ।আর ওর কষ্টে তোমারও কষ্ট হবে।কারন ও তো তোমার মনপাখি, তোমার প্রাণভোমরা।
ভালো থেকো তোমার প্রাণভোমরাকে নিয়ে। ভালো থেকো আমার ভালোবাসা। আমি চিরতরে তোমাদের জীবন থেকে চলে গেলাম দূরে। বহুদূরে।
ইতি
ইরানি"
রুমের মধ্যে পিনপতন নীরবতা। চাপাস্বরে কাঁদছে নিশি আর মুনতাশা। ওরা মানতেই পারছেনা ইরানি আর নেই।
নাবহান চুপচাপ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বসে আছে। আজ নিজেকে বড্ড দোষী মনে হচ্ছে তার। তার জন্যই আজ পৃথিবীতে নেই ইরানি।
সবার ভাবনার মধ্যেই সাদিয়া বলে উঠলো,
-"যদি ইনায়াত ১৭ বছর পর দেশে ফেরে আর তার ফেরার আগেই ইরানি সুইসাইড করে তাহলে এই ছবিগুলো কবে তোলা?"
সাদিয়ার কথায় নিশি নড়েচড়ে বসল। ছবিগুলোর দিকে ভালো করে তাকিয়ে বললো,
-" সাড়ে চারবছর আগেও তো ও এমনই দেখতে ছিলো। তাহলে কি ছবিগুলো তখনকার? আর যদি তাই হবে তাহলে এতো হাসিখুশি কিভাবে?"
মুনতাসির বললো,
-"তারমানে ইরানি ইনায়াত আসার পরও বেঁচে ছিলো? তাহলে এই দড়ি ,এই রক্ত এগুলো কি?"
-"এইসব প্রশ্নের উত্তর আমি দিচ্ছি।"
ইনায়াতের কন্ঠ শুনে সবাই দরজার দিকে তাকালো । আর বলল...
উপস্থিত সবার উৎসুক দৃষ্টি ইনায়াতের দিকে। ইনায়াতের পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে মুনতাশার বাবা। কালবিলম্ব না করেই মুনতাশা তার বাবার কাছে ছুটে গেলো। ঝাপিয়ে পড়লো বাবার বুকে। কত শান্তি,কত স্বস্তি এই বুকটায়।মুনতাশার বাবাও খুব যত্নে আগলে নিলেন মেয়েকে।
মুনতাসিরও গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো বাবার কাছে। বাবা সেটা দেখে ঈষৎ হাসলেন। হাতের ইশারায় কাছে বসতে বললেন। মুনতাসির বসা মাত্রই এক হাতে জড়িয়ে নিলেন তিনি। বিরবির করে বললেন, "আমার গাধা দুইটা।"
প্রায় সাড়ে তিন বছর পর বাবা-সন্তানের এ মিলনমেলা দেখে প্রত্যেকেরই চোখে পানি এসে গেছে। ইনায়াত অপরাধী ভঙ্গিতে হাঁটু গেড়ে বসলো মুনতাশা, মুনতাসির ও তাদের বাবার সামনে। হাত জোড় করে তাদের কাছে ক্ষমা চাইলো।
মুনতাশা আর মুনতাসিরের বাবা তাদের ইশারায় বললো ওকে ক্ষমা করে দিতে। তারা দুজনেই ক্ষমা করলো ইনায়াতকে।
ইনায়াত মুনতাশার পা আঁকড়ে ধরে বললো,
-"আমাকে ক্ষমা করো, তাশা। বোনের প্রতি করা অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলাম আমি। নাবহানকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তোমাকে এতটা কষ্ট দিতাম আমি।"
মুনতাশা ইনায়াতের থেকে তার পা মুক্ত করে নিয়ে বললো,
-"তোমাকে আমি ক্ষমা করেছি ইনায়াত। তুমি ছেড়ে দিয়েছো বলে আমি নাবহানকে পেয়েছি আবারো।আমি সব ভুলে গেছি। তুমিও ভুলে যাও।"
-"সত্যিই কি ভুলে গেছো তাশা? ভুলতে পেরেছো?"
মুনতাশা এ কথার উত্তর দিলো না। বললো,
-"এরপর ইরানির কি হয়েছিলো সেটা বলো, ইনায়াত।"
ইনায়াত দীর্ঘশ্বাস ফেললো। একনজর তাকালো সেই দড়িটার দিকে। তারপর উঠে গিয়ে বসলো সেই চেয়ারটায়। সবাই উহসুক হয়ে চেয়ে আছে ইনায়াতের দিকে। ইনায়াত বলতে শুরু করলো,
-"সেদিন ইরানি সুইসাইডের চেষ্টা করেছিলো। এই তিনতলা বাড়িটির ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলো। ভেবেছিলো হয়তো মরে যাবে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা ওর প্রান নেয়নি।ও লাফিয়ে পড়েছিলো সেটা মাও টের পায়নি। মা তখন আমার জন্য বিভিন্ন রান্না করায় ব্যাস্ত।ছাদ থেকে নিচে পড়ার পর কতক্ষন ওভাবে ছিলো আমি জানিনা।
আমি বাড়িতে আসার পর ভেতরে গিয়ে মা আর ইরানিকে খুব জোরে জোরে ডাকছিলাম। মা তো ডাক শুনে এসেছিলো কিন্তু আমার বোনটা আশেপাশে কোথাও ছিলো না। আমি ভাবলাম হয়তো অভিমান করেছে তাই আসছে না। নিজেই গেলাম ওর রুমের দিকে। দরজা খোলাই ছিলো। রুমে,ওয়াশরুমে সবজায়গায় খোঁজার পরও ওকে পেলাম না।
আমার বুকের মধ্যে হঠাৎই ফাঁকা লাগছিলো। দৌড়ে মায়ের কাছে গেলাম। মাকে বললাম ও রুমে নেই। মা বললো হয়তো ছাদে নাহলে গার্ডেনে আছে।
ওর নাকি নতুন দুটি রোগ হয়েছিলো। একটা হলো আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা,আরেকটা হলো গাছের সাথে কথা বলা।
আমি মায়ের কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। ভাবলাম আগে গার্ডেনেই যাই। তাছাড়া এতোপথ জার্নি করে এসে ছাদে যাওয়ার এনার্জি ছিলো না আমার।
যেমন ভাবলাম তেমনটাই করলাম। গার্ডেনের পথে হাঁটা ধরলাম তবে পুরোটুকু যাওয়া লাগলো না। আমার কষ্ট কমানোর জন্য আমার বোনটা মাঝপথেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো।"
ইনায়াত ডুকরে কেঁদে উঠলো। কাঁদলো রুমের প্রতিটি মানুষ। একটা ভাইয়ের সামনে বোনের এভাবে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকা ঠিক কতটা যন্ত্রণাদায়ক তা পুরোপুরি উপলব্ধি না করতে পারলেও কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে সবাই।
ইনায়াত একটা গাঢ় শ্বাস নিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। আবারও বলা শুরু করলো,
-" আমার পুরো দুনিয়াটাই থমকে গিয়েছিলো তখন। আমি নিজ জায়গাতেই একটা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামান্য নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
হঠাৎ মনে হলো আমার বোনের শ্বাস চলছে। আমি দৌড়ে ওর কাছে গিয়ে পালস্ চেক করলাম। ওর পালস রেট খুব কম ছিলো । আমি দ্রুত ওকে কোলে তুলে নিলাম। প্রায় দৌড়ে গাড়ির কাছে নিয়ে ওকে গাড়িতে শুইয়ে দিলাম। মাকে চিৎকার করে বললাম, আমি আসছি তুমি রান্না করো। আমি চাইনি মা ওকে এভাবে দেখুক। তাই তার অগোচরেই হসপিটালের উদ্দেশ্য চলে গেলাম।
দুদিন বাদে জ্ঞান ফিরলো ওর ।মাকে সেদিন বাড়িতে গিয়ে খুব ধীরে সুস্থে বুঝিয়েছিলাম আমি। মা কিছুটা শান্ত ছিলো। ইরানির জ্ঞান ফেরার পর আমি আর মা ওর কাছে যাই। ও কেমন যেন বাচ্চাদের মতো এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলো। আমাকে আর মাকে একনজর দেখে অন্যদিক দেখায় মন দিলো।
আমি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে ডাক্তারের দিকে তাকাতেই সে আমাদেরকে তার কেবিনে যেতে বললো। আমি মাকে ইরানির কাছে রেখে ডাক্তারের কাছে গেলাম।
ডাক্তার সেদিন কি বলেছিলো জানো? ডাক্তার বলেছিলো,
'পেশেন্টের যে সমস্যাটি হয়েছে সেটার নাম হলো "ট্রমাটিক ব্রেইন ইঞ্জুরি"। এই সমস্যা হলে পেশেন্টের আইকিউ লেভেল একটা বাচ্চার মতো হয়ে যায়। সে পূর্বের সবকিছু ভুলে গিয়ে শিশুসুলভ আচরনে মত্ত হয়ে ওঠে। তার বয়স ২০ হলেও আর আচরন ৪-৫ বছরের একটি বাচ্চার মতো হয়।তবে ধীরে ধীরে তার অতীত জীবন মনে পড়বে।'
ডাক্তারের কথাটি তখন খুব ভালোভাবে বুঝতে না পারলেও পরে বুঝেছিলাম। আমার বোনটা একদম বাচ্চাদের মতো হয়ে গিয়েছিলো। শুধু হাসতো। মা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতো ওর দিকে। আমাদের দিনগুলো কিভাবে কাটতো সেটা তোমরা কেউ বুঝতে পারবে না। ওর সামনে থেকে ওর অতীতের সব জিনিস সরিয়ে ফেলেছিলাম আমি।
এইযে ছবিগুলো সবই সেই সময়ের। ওর চিকিৎসার জন্য একজন নিউরোসার্জনের কাছে নিয়মিত নিয়ে যেতাম ওকে। ডাক্তার বললো ওর অবস্থা কিছুটা ভালো হয়েছে। এখন অস্ত্রপচারের মাধ্যমে ওকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব।
আমি মনে মনে খুশি হয়েছিলাম কারন আমার বোন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। আমি তখনো বুঝিনি যে ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল।
জানো তাশা,ও সুস্থ হয়ে গিয়েছিলো। সুস্থ হওয়ার পর আমার সাথে আর কথা বলতো না। নিজের ঘরেই বসে থাকতো।ও কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে দেখে ছয়দিনের মাথায় আমি একটু কাজে বাইরে গিয়েছিলাম।মা নিজের ঘরে ছিলো।
সেদিন কোন ফাঁকে যেন ও আমার এই ঘরে চলে আসে। ওর অতীত জীবনের সমস্ত জিনিস এখানেই রেখেছিলাম আমি।ওই টেডিবিয়ার আর ডায়েরিটা ও খুঁজে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছিলো। এরপর। এরপর কি হয়েছিলো আমি জানিনা তাশা। আমি যখন ফিরলাম তখন মা ইরানির রুমের মেঝেতে নির্বিকার ভাবে বসে ছিলো।"
-"আর ইরানি?" কান্না মিশ্রিত কন্ঠে প্রশ্ন করলো নিশি।
-"ইরানি সিলিংয়ে ঝুলছিলো। সারা শরীরে আঁচড়ের দাগ দিলো। প্রতিটা জায়গা থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছিলো। বিছানার উপর ক্ষতবিক্ষত টেডিবিয়ারটি পড়ে ছিলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো ওর সমস্ত রাগ এই টেডিটার উপর ঝেড়েছে।
সেদিনই আমি পড়েছিলাম এই ডায়েরিটা।আমার মা সেদিনের পর থেকে আর কথা বলেনি। অতিরিক্ত শকে সে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলো।"
নিশি পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে। তার মনে পড়ছে জুলজি ল্যাবে প্রাকটিক্যাল ক্লাসের কথা। সেখানে তাদের ব্যাচের একটা ছেলের হাত কেটে গিয়ে রক্ত ঝরছিলো প্রচুর।সেই রক্ত দেখেই ইরানির কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়। পরে জানা যায়, ইরানির রক্তে ফোবিয়া আছে।
যে মেয়ের রক্তে ফোবিয়া ছিলো সেই মেয়ে নিজেকে এভাবে রক্তাক্ত করেছিলো? বিশ্বাসই হচ্ছে না নিশির।
-"তার মানে তুমি প্রতিশোধের জন্যই তাশাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে?"
মুনতাসিরের প্রশ্নে নিশির ধ্যান ভাঙে আর ইনায়াতও অনুশোচনায় দগ্ধ একজোড়া চোখে তাকায় মুনতাশার দিকে।তারপর মাথাটা আবার ঝুঁকিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে,
-"আমার মা-বোনের সাথে যা হয়েছে তার জন্য আমি শুধুমাত্র তোমাকে আর নাবহানকে দায়ী করেছি,তাশা। আমার কলিজার টুকরাটা তোমাদের জন্যই এতো কষ্ট পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। তোমাদের কিভাবে ছেড়ে দিতাম বলো?
আমি তোমাদের খুন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু খুন করলে তো তোমরা একবারেই মরে যেতে। আমার বোনের মতো বারবার তো মরতে না। আমি চেয়েছিলাম আমার বোনের মতো প্রতিনিয়ত মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করবে তোমরা। তাইতো প্লান করলাম নাবহানের প্রাণভোমরাকে কেড়ে নিয়ে কষ্ট দিবো আর সেই কষ্টে জর্জরিত হবে নাবহান নিজেও।
একদিন রাস্তায় সাদিয়ার বাবার সাথে তোমার বাবাকে দেখি । ততদিনে তোমাদের সবার ব্যাপারে মোটামুটি খোঁজখবর নেওয়া হয়ে গিয়েছিলো আমার। কোনোভাবে জানতে পারি সাদিয়ার সাথে মুনতাসিরের বিয়ের কথা বলছে তারা দুজন। সেদিন থেকেই সাদিয়াকে টার্গেট করি। সাদিয়াও আমার প্রেমে পড়ে যায়। সে বিয়ে ভাঙতে চাইলে বারন করি।তাকে সম্পত্তির কথা বলে রাজি করাই।এরপর তোমার সার্বক্ষণিক তথ্য সাদিয়াই আমাকে দিতো।
তোমার বাবার তোমাকে বিয়ের কথা বলা,তার এক্সিডেন্ট, নকল ডেডবডি,তোমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বিয়েতে রাজি করানো এ সবটাই আমার প্ল্যান ছিলো।তোমাকে এতোটা যন্ত্রণা দিয়েও আমার মন ভরছিলো না।তোমার কষ্টের মাত্রা আরো বাড়াতেই তোমার বাবাকে এই সাড়ে তিন বছর ধরে আটকে রেখেছিলাম আমি।তারপর বাচ্চাদুটো সহ তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে বের করে দেই। সারাজীবন মানুষের কটু কথা শুনবা এটাই চেয়েছিলাম আমি।
কিন্তু যেদিন সাদিয়ার বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেলো সেদিনই হঠাৎ আমার রাদ আর হৃদির কথা মনে পড়েছিলো।আমি ভিতরে ভিতরে খুব ভেঙে পড়েছিলাম সেদিন। তবুও আমি সাদিয়াকে ওই কঠোর কথাগুলো বলেছিলাম কারন আমি চেয়েছিলাম সাদিয়াও নিজের কাজের জন্য অনুতপ্ত হোক আর সবটা তোমাদের বলুক। দেখো,ও সেটাই করেছে।
তাশা, সেদিন বাড়িতে এসে আমি অস্থির হয়ে উঠি। তোমার বাবাকে মুক্ত করে দেই কিন্তু তিনি আমাকে ছেড়ে যাননি।আমাকে বুঝিয়েছেন উনি।
আমি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম তাই ভুল করেছি, স্বেচ্ছায় করিনি এমনটাই বলেছিলেন তিনি। আমি যখন থেকে সবটা বুঝেছি তখন থেকেই অনুতপ্ত হয়েছি, অপরাধবোধে শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি। আমি আমার নিজের ছেলেমেয়ে দুটোর সাথেও কি জঘন্য আচরণ করেছি। ছিঃ। নিজের প্রতি ধীক্কার। বাবা হওয়ার যোগ্য নই আমি, তাশা।
তুমি আর নাবহান ওদের মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলো।আমার মতো অমানুষ যেন না হয়।
তোমরা প্রত্যেকেই আমাকে ক্ষমা করে দিও দয়া করে।"
সকলেই সেদিন ক্ষমা করে দিয়েছিলো ইনায়াতকে। ইনায়াতও পরিস্থিতির চাপে পড়েই হিংস্র হয়ে উঠেছিলো।তাই কেউ আর তার প্রতি রাগ পুষে রাখেনি।
ইনায়াত সাদিয়ার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। তার হাত দুটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,
-"আমাকে আরেকবার সুযোগ দেবে, সাদিয়া? একসাথে বাঁচার সুযোগ?"
সাদিয়া মুচকি হেসে সাদরে গ্রহণ করেছিলো ইনায়াতকে। তা দেখে সাদিয়ার মুচকি হাসিটা সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলো। আনন্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছিলো সবার প্রানে। মনে তখন একটাই প্রশ্ন,"পৃথিবীটা এতো সুখময় কেন?"
আদৌ কি পৃথিবী সুখময়?
কখনো সুখ ,কখনো দুঃখ এমনটাই তো সৃষ্টির নিয়ম। পৃথিবী যেমন সুখময় তেমনি দুঃখময়।
---------------------------------
-"মাম্মাম, আমার রিমোর্ট কন্ট্রোল গাড়িটা কোথায়?"
রাদিয়াতের প্রশ্নে অতীতের অধ্যায় টা বন্ধ করে বেরিয়ে আসে নিশি।
সেদিনের পর কেটে গেছে ছয়টি বছর। রাদিয়াত আর হৃদিশার বয়স এখন আটের কাছাকাছি। রাদিয়াত বেশ চঞ্চল প্রকৃতির হলেও হৃদিশা তেমন শান্তই আছে।
নিশি রাদিয়াতের সাথে পা বাড়ালো তার রিমোর্ট কন্ট্রোল গাড়ি খোঁজার জন্য। রাদিয়াতের গাড়ি খুঁজে দিয়ে নিশি গেলো হৃদিশার ঘরের দিকে।
ফ্যান ছেড়ে দিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে হৃদিশা। আজও ছোটবেলার মতোই ঘুমকাতুরে আছে সে। প্রতিদিন তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে স্কুলে পাঠাতে বেশ কসরত করতে হয় নিশির।
এই ছেলেমেয়ে দুটো নিশির প্রান। ভীষণ ভালোবাসে এদেরকে সে। এরা ব্যতীত নিজের অস্তিত্বই খুঁজে পায়না আজকাল।
নিশি এগিয়ে গিয়ে কাঁথাটা মুখের উপর থেকে টেনে বুক অবধি নিয়ে এলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ধীরপায়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে।আজ শুক্রবার তাই ওকে আর জোর করে ঘুম থেকে তুললো না।
হৃদিশার রুম থেকে বেরিয়ে নিশি তার শ্বশুরের রুমে গেলো। তাকে রোজ সকালে ঘুম থেকে তুলে দিতে হয় নিশির। এটা নিশির নিত্যদিনের রুটিন। মুনতাশার বাবা শোয়া থেকে উঠে বসলেন। নিশিকে বললো,
-"ওরা উঠেছে ঘুম থেকে?"
-"হ্যাঁ বাবা।হৃদিশা ছাড়া সবাই উঠেছে।"
-"মেয়েটা একদম মায়ের স্বভাব পেয়েছে। কিভাবে যে এতো ঘুমায়?"
বৃদ্ধের চোখেমুখে আস্তে আস্তে ভেসে উঠছিলো একরাশ দুঃখ। নিশি সেটা দেখেই তড়িঘড়ি করে বললো,
-"বাবা আমি যাই। ব্রেকফাস্ট রেডি করতে হবে।"
বলেই বেরিয়ে গেলো নিশি। পিছনে তাকালে হয়তো দেখতো তার শ্বশুরের বুক চিরে বের হওয়া একটি দীর্ঘশ্বাস।
ড্রয়িং রুমে পা রাখতেই দেখলো মুনতাসির সোফায় বসে আছে আর তার গলা ধরে ঝুলে আছে রাদিয়াত। নিশি দূর থেকেই বললো,
-"ওভাবে বাদুড়ঝোলা হয়ে আছিস কেন,রাদ?"
কথাটা শুনেই রাদিয়াত ঘাড় ঘুরিয়ে কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো নিশির দিকে। সাথে সাথেই নিশির বুকটা ধক করে উঠলো।এই দৃষ্টিতে সে একনজর যেন মুনতাশাকে দেখলো।
ছেলেটা যত বড় হচ্ছে ততই যেন তার মায়ের রূপ গভীর ভাবে প্রকাশ পাচ্ছে ওর মধ্যে।
নিশির মধ্যে আবারও নাড়া দিয়ে উঠলো অতীতের আরেকটি অধ্যায় যেখানে ছিলো কিছু সুখ, কিছু দুঃখ, কিছু হাসি, কিছু কান্না আর আছে হারানোর বেদনা।
নিশি আর মুনতাসিরের বিয়ের আর চারদিন বাকি। ডেকোরেশনের পুরো কাজটা ইনায়াত নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিয়েছে। সেও এখন এই পরিবারেরই একজন সদস্যের মতো।
সেদিন রাতেই ইনায়াত আর সাদিয়াকে মুনতাশার বাবা সঙ্গে করে তাদের বাড়িতে এনেছিলেন। পরদিন সকালে ইনায়াত-সাদিয়া কোর্ট ম্যারেজ করে নেয়। এখন তারা স্বামী-স্ত্রী।
নিশি আর মুনতাসিরের বিয়ে হওয়া পর্যন্ত তাদের এবাড়িতে থাকতে হবে এমন আদেশ করেছেন মুনতাশার বাবা। তারাও হাসি মুখে রাজি হয়ে গেছে।
এ কয়দিনে রাদিয়াত আর হৃদিশার প্রতিও বেশ মায়া জন্মেছে ইনায়েতের। মুনতাশা এটা বুঝতে পেরে বেশ ভয়ে থাকে ।এই বাচ্চাদুটোকে যদি ইনায়াত কেড়ে নিয়ে যায় তবে? সে তো বাঁচতে পারবে না।
ইনায়াত হয়তো মুনতাশার মনের কথাটা বুঝতে পেরেছিলো। তাই সে মুনতাশাকে ডেকে খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বললো,
-" এই বাচ্চাদুটো শুধুমাত্র তোমার তাশা। আমি যে কদিন আছি এবাড়িতে সে কদিন একটু ওদের কাছাকাছি থাকবো। কিন্তু ওদের উপর কখনো অধিকার খাটাবো না আমি। বিশ্বাস রাখতে পারো আমার উপর।"
কথাগুলো শোনার পর মুনতাশা একটু স্বস্তি পেলো।
মুনতাশা আর নাবহানও বিয়ের পর থেকে এখানেই আছে। নাবহানের মা আর মুনতাশার বাবা সারাদিন গল্প করে। মুনতাশা ভাবে সে আর নিশিও হয়তো এতো গল্প করে না। এরা এতো কি কথা বলে তা বুঝে উঠতে পারে না সে।
এই বিয়েতে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো,
নিশির বিয়ের যাবতীয় সবকিছু শপিং মুনতাসির একা করেছে নিজের পছন্দে এবং মুনতাসিরের জন্য শেরোয়ানিসহ সবকিছু নিশি নিজের পছন্দে একাই কিনেছে। অদ্ভুতভাবে দুজনের পছন্দ দুজনেরই দারুন লেগেছে।
দেখতে দেখতে কেটেগেছে তিনদিন। আজ সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। এতে মুনতাশার মন বড্ড খারাপ। এমন বৃষ্টি হলে তার ভাইয়ের বিয়েটাই মাটি হয়ে যাবে।
গার্ডেনে মুনতাসিরের হলুদ সন্ধ্যা এনজয় করছে সবাই। রাদিয়াত কান্না করছিলো বলে তাকে নিয়ে নিজের রুমে চলে এসেছে মুনতাশা।
ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে।মুনতাশা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ পেটের কাছে শীতল কিছুর অস্তিত্ব টের পেলো সে। চমকে উঠে পেছনে তাকাতে গিয়ে কারো বুকে ধাক্কা খেলো। সে জানে এই বুকটা কার। সারারাত এই বুকে ঘুমাতে ঘুমাতে বড্ড পরিচিত হয়ে গেছে যে।
নাবহানের হাত মুনতাশার পুরো পেট জুড়ে বিচরন করছে। মুনতাশার সুড়সুড়ি লাগছে সাথে পুরো দেহে বয়ে যাচ্ছে শিহরণ। খপ করে নাবহানের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো মুনতাশা। হাত ধরার পর বুঝতে পারলো নাবহানের হাতে কিছু একটা আছে।মুনতাশা নাবহানের হাত ছেড়ে দিলো।
নাবহান মুনতাশাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দুহাত তার দুগালে আলতো করে টেনে দিলো। গাল ধরেই কপালে চুমু খেলো। মুনতাশা লজ্জায় মাথা তুলে তাকাতে পারছে না। নাবহান মুনতাশার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
-"তোমার আমার হলুদ সন্ধ্যা শুভ হোক মনপাখি।আমাদের না হওয়া হলুদ সন্ধ্যা হয়ে গেলো এখন।"
মুনতাশা চোখ মেলে তাকালো নাবহানের দিকে। দুপায়ের সামনের দিকে ভর দিয়ে উচু হয়ে দাঁড়ালো নাবহানের কাঁধ ধরে। তারপর নিজের গালটা নাবহানের গালে হালকা করে ঘষা দিলো। নাবহান তার দুহাত রাখলো প্রিয়তমার উন্মুক্ত কোমড়ে।
মুনতাশার ঘোর কেটে গেলো নাবহানের ঠোঁট চেপে হাঁসা দেখে। লজ্জায় পড়ে গেলো মুনতাশা। দু'হাতে মুখ ঢেকে ফেললো।একটু আগের করা কাজটা মনে পড়তেই তার কান গরম হয়ে উঠলো।মনে মনে বললো, " আল্লাহ, মাটি ফাঁক করে দাও,আমি ঢুকে পড়ি। এই মুখ আমি কাউকে দেখাবো কি করে ।"
নাবহান এবার শব্দ করে হেসে