11/05/2026
শুরুতে বলে নিই, আমি হয়তো খুব ভালো মানুষ না। এবং বেগারে দান-খয়রাত করতেও আমার বিশেষ আগ্রহ নাই। এই ডিসক্লেইমার আর সেল্ফ সেন্সরশিপ দিয়েই শুরু করি।
আমি যেখানে কফি খাই, সেখানে নানা কিসিমের মানুষের আনাগোনা। কেউ আসে আড্ডা দিতে, কেউ আসে কাজ করতে, কেউ আসে শুধু বসে থাকতে। আর বেশ কিছুদিন ধরে সেখানে ছিন্নমূল কিছু শিশুর আনাগোনাও বেড়েছে। হাত পাতে। আমি টাকা দিই না। যেকোনো শিশুকেই আমি টাকা দিই না। এই জায়গায় আমার একটা কঠিন, হয়তো নির্মম, নীতি আছে।
যাই হোক, সেই মহলে একদিন একজন লোক এলো। লোকটার পরিবার আছে। একটা ছোট ফুটফুটে মেয়েও আছে। দেখে মনে হলো, লোকটা সম্ভবত ফ্রিল্যান্স সার্ভিস প্রোভাইডার—ডিজাইন, ফিল্মমেকিং, এ রকম কোনো ক্রিয়েটিভ কাজ করে। শহরের ভেতরকার সেই ভাসমান পেশাজীবী মানুষদের মতো- ল্যাপটপ, কফি, ফোনকল, আর মাঝেমধ্যে নিজের ভেতরের নীরব ক্লান্তি নিয়ে বসে থাকা।
এই লোকটার কাছেও এক পথশিশু এসে টাকা চাইলো। লোকটা আমার মতোই দিলো না। কোনো ব্যাখ্যা না, কোনো বিরক্তিও না। শুধু না।
একটু পর সেই একই জায়গায় একটা ছিন্নমূল কুকুরছানা এলো। ছোট, অসহায়, কিন্তু তবু নিজের মতো স্বাধীন। লোকটা তাকে একটু আদর করলো। কুকুরছানাটাও মানুষের আদর বুঝে নিলো, তারপর আবার নিজের পথে হাঁটা দিলো।
কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে সে রাস্তায় নামতে চাইলো। রাস্তায় অনেক গাড়ি। এই শহরে গাড়িগুলো কারও দিকে তাকায় না- না মানুষ, না পশু, না শিশুর দিকে। কুকুরছানাটা হয়তো চাপা পড়তে পারে, আহত হতে পারে, মরে যেতে পারে, এই আশঙ্কায় লোকটা হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলো।
দূর থেকে বললো,
“নামিস না বাবা। মরে যাবি।”
এই “বাবা” ডাকটাই আমাকে থামিয়ে দিলো।
একটু পর সেই ছিন্নমূল ছেলেটা এসে কুকুরছানাটাকে ডাকলো। কুকুরছানাটা সাড়া দিলো। মানুষে-পশুতে কী অদ্ভুত বন্ধুত্ব! শহরের ফুটপাতেও সংসার থাকে, সম্পর্ক থাকে, দায়িত্ব থাকে-মশুধু আমাদের চোখে পড়ে না।
কুকুরছানাটার সম্ভাব্য করুণ পরিণতি এড়ানো গেছে দেখে লোকটা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
তারপর সে ছিন্নমূল শিশুটিকে ডাকলো।
জিজ্ঞেস করলো,
“কুকুরটা তুই পালিস?”
ছেলেটা বললো,
“হ্যাঁ।”
লোকটা তখন ওয়ালেট খুললো। একশ টাকার একটা নোট বের করে ছেলেটার হাতে দিলো। বললো,
“কুকুরটাকে কিছু একটা খাওয়াইস।”
আমি তাকিয়ে রইলাম।
একটু আগেও যে লোকটা শিশুটিকে টাকা দেয়নি, সে-ই লোকটা এখন সেই শিশুকেই টাকা দিলো। কিন্তু শিশুটির জন্য না। কুকুরটার জন্য।
এখানেই আমার ভেতরে কোথাও একটা খচখচ করলো।
আমরা সম্ভবত মানুষের দুঃখে ক্লান্ত হয়ে গেছি। মানুষের ক্ষুধা, মানুষের হাত পাতা, মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, এসব আমাদের কাছে এত পরিচিত হয়ে গেছে যে আর বিশেষ কিছু মনে হয় না। বরং বিরক্তি লাগে। সন্দেহ হয়। মনে হয়, টাকা দিলে অপব্যবহার করবে। মনে হয়, এরা পেশাদার। মনে হয়, এই সিস্টেমকে আমি ফিড করবো না।
কিন্তু একটা কুকুরছানা রাস্তার দিকে নামতে চাইলে আমাদের বুক কেঁপে ওঠে।
আমরা তাকে “বাবা” বলে ডাকি।
তার জন্য চিন্তা করি।
তার খাবারের ব্যবস্থা করি।
তার সম্ভাব্য মৃত্যুকে কল্পনা করেও অস্থির হয়ে যাই।
অথচ যে শিশুটি প্রতিদিন রাস্তার ওপরেই বড় হচ্ছে, গাড়ির পাশে, ধুলার পাশে, মানুষের অবহেলার পাশে-তার জন্য আমাদের বুক ততটা কাঁপে না।
হয়তো কুকুরছানাটার প্রতি মায়া ভুল না। মায়া কখনো ভুল হতে পারে না।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
আমরা কবে থেকে এমন হয়ে গেলাম যে একটা ছিন্নমূল কুকুরছানার নিরাপত্তা আমাদের বেশি নাড়া দেয়, অথচ একটা ছিন্নমূল শিশুর অনিরাপদ জীবন আমাদের কাছে প্রায় স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়ায়?
এই শহরে কুকুরের জন্য মায়া আছে।
মানুষের জন্য আছে যুক্তি, সন্দেহ, বিরক্তি আর দূরত্ব।
আর হয়তো এই জায়গাতেই আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে নীরব ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে।
রিদওয়ান মাহমুদ