06/09/2025
𝑻𝒂𝒍𝒆 𝒐𝒇 𝒂 𝑽𝒊𝒔𝒊𝒐𝒏𝒂𝒓𝒚 𝑭𝒊𝒈𝒉𝒕𝒆𝒓
একজন দৃষ্টিযোদ্ধার সংগ্রামের গল্পঃ
ছবিতে শত বাঁধা-প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে একজন দৃষ্টিযোদ্ধা কার্জন হলে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) জীবনের শেষ পরীক্ষা দিচ্ছেন। বিগত ছয় বছরে আমরা যারা কার্জন হল পরীক্ষা কেন্দ্রে যাতায়াত করেছি, তাঁদের চোখে হয়তো পড়েছে-একজন পরীক্ষার্থী বাইরে প্রখর সূর্যের আলো এবং মাথার উপর অসংখ্য টিউব লাইট থাকা সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে খাতার দিকে ঝুঁকে একাগ্রচিত্তে লিখে যাচ্ছেন।
তাঁর সম্পর্কে তাঁর মুখ থেকেই শোনা যাক—
“স্যার, আমি retinitis pigmentosa নামক এক জেনেটিক রোগে আক্রান্ত (এখনও কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি)। প্রথম সনাক্ত হয় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত বোর্ডের লেখা দেখতে পাই না। প্রথমে লেখা কোনো লাইন দেখে পরের লাইন লেখতেও অনেক সমস্যা হয়। পরীক্ষায় খাতায় যা লিখি, সেটা রিভিশন করতে পারি না। সম্পূর্ণ ক্যালকুলেশন একরকম মুখে মুখেই করতে হয়। অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষায় আমার সিট অন্ধকার জায়গায় পড়ার ফলে আমি প্রশ্ন বা খাতার কিছুই দেখতে পাইনি। পেছন থেকে একজন প্রশ্ন পড়ে দিয়েছে এবং আমার রোল নম্বরের বৃত্ত পূরণ করে দিয়েছে। আমি খাতায় কিছু দেখতে না পেয়েও সম্পূর্ণ আন্দাজে লিখেছিলাম। এরপর এসএসসি ও এইচএসসিতে আমি চার্জার লাইট ব্যবহার করা শুরু করি। ঢাবি ভর্তি পরীক্ষায় অন্ধকারে সিট পড়ায় ৩৫–৪০ মিনিট আমি কিছু লিখতে বা পড়তে পারিনি। পরে কক্ষ পরিদর্শক আমাকে জানালার পাশে বসালে আমি পরীক্ষা শুরু করি, তবে আমাকে কোনো অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়নি। আর অনার্সের ঘটনাগুলো তো আপনি জানেনই, স্যার। সর্বোপরি পড়া এবং লেখা উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়।”
মোঃ আমিন খান ২০১৭–২০১৮ সেশনে ফলিত গণিত বিভাগে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের (৩.০০ এর বেশি জিপিএসহ) সাথে বি.এস. ও এম.এস. সম্পন্ন করেছেন। ফলিত গণিত বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম স্যার শুরু থেকেই তাঁর প্রতি যথাযথ খেয়াল রেখেছিলেন এবং হলে তাঁর জন্য একটি ভালো সিটের ব্যবস্থা করতে আমাকে (আমি আবাসিক শিক্ষক ছিলাম) বলেছিলেন। আমার বিভাগের সম্মানিত শিক্ষকেরা তাঁকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন; তাঁর জন্য প্রতি পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময়ের ব্যবস্থা করেছেন (বিধি মোতাবেক প্রতি ঘণ্টায় ১০ মিনিট) এবং তিনি যেন পড়তে পারেন, সে জন্য Bold ও Large Font-এ প্রশ্ন ছাপিয়েছেন। ফলিত গণিত পরিবারের শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী তাঁকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন; বিশেষভাবে বলতে হবে তাঁর সার্বক্ষণিক দুইজন সাথীর কথা; একজন হলেন আলিফ হোসেন এবং আরেকজন মাহদি হাসান। একজন স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন শিক্ষার্থী সহজেই পড়তে ও লিখতে পারে। কিন্তু আমিন খানের জন্য এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন ও কষ্টদায়ক কাজ। যে কোনো বিষয় পড়তে ও লিখতে তাঁর ২ থেকে ৪ গুণ বেশি সময় লেগেছে। এর উপর গণিতে Greek/Latin letters, Mathematical equations, superscript, subscript (ভাবুন তো, Tensor Analysis!)—এর স্বাভাবিক ব্যবহার অবশ্যই বাড়তি সমস্যা তৈরি করেছে। বি.এস. পাশ করতে তাঁকে Mathematica, C/C++, MATLAB, Python Programming ল্যাব ক্লাসেও ভালো করতে হয়েছে। এত কিছুর পরও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যে ফলাফল সে অর্জন করেছে, এটি আমার জীবনে দেখা সেরা ফলাফল; best of the bests!
সে যেহেতু একজন Fighter, আমি তাকে পরামর্শ দিয়েছি উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে (USA/Europe/Australia) চেষ্টা করতে। এখন সে নিজের কর্মজীবন নিয়ে শঙ্কিত; কী ধরনের চাকরি তাঁর জন্য উপযুক্ত হবে, কোথাও চাকরি পাবেন কি না—এসব নিয়ে চিন্তিত। কারও কাছে যদি তাঁর জন্য উপযুক্ত চাকরি বা বৃত্তি (বিদেশে পড়াশোনার জন্য) সম্পর্কিত প্রস্তাব বা পরামর্শ থাকে, তাহলে তাঁকে (০১৯৫৭০৩৪৩৩৪, [email protected]) জানাতে পারেন।
- প্রফেসর জাভীদ ইকবাল বাঙালী