30/10/2026
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের বাবুপুরে ৭০০ পরিবারের শিশু-কিশোরদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ। দীর্ঘদিনের মাঠের অভাব ঘুচাতে গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে কেনা হয়েছে ৬০ শতাংশ জমি।
চারপাশে যখন একের পর এক অসহনীয় খবর, তখন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের বাবুপুর গ্রামে ঘটেছে এক আনন্দের ঘটনা। গ্রামের শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠের জন্য জমি কিনেছেন গ্রামবাসী। কারও চাঁদা ২০০ টাকা, কারও ৫০০, আবার কেউ দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা। জমি বিক্রেতাও দামের বাইরে এক শতাংশ জমি দান করেছেন। এই উদ্যোগে আনন্দে মেতেছেন পুরো গ্রামের মানুষ।
বাবুপুর গ্রামে ৭০০-এর বেশি পরিবারের সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের বাস। তাঁদের বড় একটি অংশ শিশু, কিশোর ও তরুণ। অথচ গ্রামে ছিল না কোনো খেলার মাঠ। ধান কাটার পর ফাঁকা জমিতে খেলত শিশুরা। ফসলের আবাদ শুরু হলে বন্ধ হয়ে যেত সেই খেলা। এভাবে বছরের পর বছর মাঠের অভাবে বেড়ে উঠছিল গ্রামের শিশু-কিশোরেরা।
মাঠের জন্য আগে অনেকবার উদ্যোগ নিয়েও সফল হননি গ্রামবাসী। এবার গ্রামের সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদসহ কয়েকজন নতুন করে উদ্যোগ নেন। তাঁরা পরামর্শ চান গ্রামের ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলমের। এরপর গ্রামের কয়েকজন বিত্তবান মানুষের সঙ্গে কথা বলেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পান।
গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামের মানুষকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভা করেন উদ্যোক্তারা। সভায় সবাই একমত হন, গ্রামের শিশু-কিশোরদের জন্য একটি খেলার মাঠ প্রয়োজন। এরপর শুরু হয় জমি কেনার জন্য অর্থ সংগ্রহ।
গ্রামের মানুষের কাছে অর্থসহায়তা চাওয়া হলে সাড়া দেন সবাই। কেউ দেন ২০০ টাকা, কেউ ৫০০, কেউ ১ হাজার টাকা। আবার সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ দেন ২ হাজার, ৫ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকা। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে এগিয়ে যেতে থাকে মাঠ কেনার উদ্যোগ।
গ্রামের ইকবাল হোসেন সুজন ৬০ শতাংশ জমি বিক্রি করতে রাজি হন। প্রতি শতাংশ জমির দাম নির্ধারণ করা হয় ৫২ হাজার টাকা। তবে সুজন পুরো ৬০ শতাংশ জমির দাম নেননি। ৫৯ শতাংশ জমির মূল্য নিয়ে বাকি এক শতাংশ জমি দান করেন তিনি।
অবশেষে গতকাল বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সুজনের কাছ থেকে জমিটি বুঝে নেন গ্রামবাসী। এরপর সবাই মিলে মাঠের মাঝখানে উত্তোলন করেন জাতীয় পতাকা। লাল-সবুজের পতাকা উড়তেই আনন্দে মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ। যুবকেরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন কয়েকজন অর্থদাতা ও প্রবীণ ব্যক্তিকে। দিনভর চলে আনন্দ-উৎসব।
গ্রামবাসীর এই উদ্যোগে খুশি গ্রামের শিশু-কিশোরেরাও। এত দিন যে মাঠের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে, এখন সেখানে খেলতে পারবে তারা। তবে এখানেই থামতে চান না উদ্যোক্তারা। মাঠের পাশে আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার লক্ষ্য রয়েছে তাঁদের।
একদিন এই মাঠ থেকেই হয়তো উঠে আসবে জাতীয় পর্যায়ের কোনো খেলোয়াড়। তবে তার চেয়েও বড় প্রাপ্তি, গ্রামের শিশুরা এবার পাবে প্রাণভরে দৌড়ানোর, খেলার ও বেড়ে ওঠার একটি জায়গা। বাবুপুরের মানুষের এই সম্মিলিত উদ্যোগ তাই শুধু একটি মাঠ কেনার গল্প নয়, এটি একটি গ্রামের স্বপ্নকে একসঙ্গে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প।