23/10/2025
দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের নিয়ে লেখালেখি করি ২০১৫ সাল থেকে।
২০১৪ সালে স্বামীবাগে তারাবীহ নামায চলার সময় রথযাত্রার অজুহাতে ইসকন মন্দিরের পক্ষ থেকে মসজিদে নামায সংক্ষিপ্ত করার চাপ দেওয়া হয়। দাবি না মানায় মসজিদের মুসল্লিদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়ে তারা।
২০১৬ সালে সিলেটের কাজল শাহ জামে মসজিদে জুমার নামাযের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে লাউডস্পিকারে বাদ্যবাজনা বাজিয়ে নামাজে ব্যাঘাত ঘটায় ইসকন। মুসল্লিরা প্রতিবাদ করলে ইসকনের সদস্যরা দা-বটি নিয়ে হামলা চালায়; এতে প্রায় ডজনখানেক মুসল্লি আহত হন।
এরপর ফেসবুকে ইসকনের বিরুদ্ধে পোস্ট দেওয়ার কারণে সিলেটের ওসমানীনগরের মসজিদের খতিব আব্দুর রহমান খুন হন। নিজ ঘরে হাত-পা বাঁধা ও গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় পাওয়া যায় তাঁর লাশ।
২০১৯ সালের জুলাইয়ে রথযাত্রার অংশ হিসেবে ইসকন চট্টগ্রামের ৩০টিরও বেশি স্কুলে, মুসলিম শিশুদের হাতে পূজার প্রসাদ দেয় এবং তাদের দিয়ে “হরে রাম, হরে কৃষ্ণ” জপ করায়। সেই ভিডিও পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা হয়।
২০২৪ সালে হাসিনার পতনের পর দেশের হিন্দুদের সংগঠিত করে “ডারতপন্থী” আন্দোলন শুরুর চেষ্টা করে ইসকনের চিন্ময়—যার বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণের অভিযোগও আছে। একই বছর চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে গলা কেটে হত্যা করা হয় অ্যাডভোকেট আলিফকে।
আজ আমরা দেখছি, ইসকনের দ্বারা র্যাডিকালাইসড বুয়েটের হিন্দু ছাত্র মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে যৌন আগ্রাসন চালাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণাতেও যুক্ত এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী ইসকন সদস্যরা।
ইসকন বছরের পর বছর পরিকল্পিতভাবে মুসলিম সমাজকে উস্কে দিচ্ছে—নামাযের সময় বাদ্যবাজনা, রাস্তায় বর্শা হাতে মার্চ, এবং ধর্মীয় উসকানিমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।
তাদের কার্যক্রমে বিদেশি ফান্ডিং আসে; সাভারে ইসকন মন্দির নির্মাণে আরএসএস থেকে সাড়ে সাত কোটি টাকার অনুদান দেওয়ার বিষয়টি ‘জাতীয় হিন্দু মহাজোট’-এর নেতা নিজেই স্বীকার করেছেন।
এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, প্রশাসন, মিডিয়া, সুশীল সমাজ এবং রাজনীতিবিদদের ভূমিকা কী?
তারা ক্রমাগত এগুলো উপেক্ষা করছে, ধামাচাপা দিতে চাইছে।
২০১৪ সালের ঘটনায় অভিযোগ করার কারণে মসজিদের ইমামকে গ্রেপ্তারের এবং মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয় গেন্ডারিয়া থানার এসআই।
২০১৬-র সিলেটের ঘটনায় পুলিশ মুসল্লিদের ওপর গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছোড়ে—অনেক মুসলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু ইসকনের একজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
খতিব আব্দুর রহমানের হত্যাকাণ্ড আজ বিস্মৃত। অ্যাডভোকেট আলিফের হত্যাকাণ্ডও সম্ভবত একই পথে যাবে।
২০২৫ সালেও আমরা দেখছি, গাজীপুরের ঘটনায় পুলিশ ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। মিডিয়া শ্রীশান্ত রায়ের ঘটনায় মুসলিম নারীদের নিশানা বানানোর দিকটা এড়িয়ে গিয়ে শুধু “ধর্ষণের অভিযোগ” বলে চালাচ্ছে।
খালি হাসিনা সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ কী? এখনকার সরকার আর রাজনীতিবিদদের অবস্থানই বা কতটা ভিন্ন?
বাস্তবতা হলো—যাকে আপনি সালিশ মেনেছেন, সেই সেক্যুলার রাষ্ট্রই আপনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রেখেছে। সে অপরাধের বিচার তো করবেই না, বরং অপরাধকে ওয়াইটওয়াশ করবে, ডাউনপ্লে করবে। আপনার প্রতিবাদকে অপরাধ গণ্য করবে।
মিডিয়া আপনাকে “উগ্র” বলে চিহ্নিত করবে। সুশীল সমাজ আপনাকে অসাম্প্রদায়িকতার পাঠ পড়াবে, আর রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের আগে মাথায় টুপি পরে এসে আপনার ভোট চাইবে। তারা আপনাকে বলবে মন্দির পাহারা দিতে—আর যখন আপনার ওপর আঘাত আসবে, তখন প্রচলিত আইনে ন্যূনতম বিচারও নিশ্চিত করবে না।
এই পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদী করণীয়ের পাশাপাশি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা জরুরি। এ নিয়ে লম্বা আলাপ করা যায়, কিন্তু মূল সমীকরণ স্পষ্ট:
রাষ্ট্র এই সমস্যা সমাধান করবে না। সেক্যুলার রাষ্ট্র এই সমস্যার অংশ—সে অপরাধীর সহযোগী, এবং আপনার ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদকেও অপরাধ বলে বিবেচনা করে।
মিডিয়া, সাংস্কৃতিক জমিদার বা তথাকথিত সুশীল সমাজও কিছু করবে না, কারণ তাদের অবস্থান আদর্শিকভাবে (এবং অন্যান্য কারণেও) হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের আরও কাছাকাছি।
রাজনীতিবিদরাও—‘খাঁটি’ বা ‘ইসলামী’ ডেমোক্রেট—কেউই শক্ত অবস্থান নেবে না, কারণ তারা পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া নিয়েই বেশি ব্যস্ত।
অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বলবেন—“এদের সাইয করতে হবে”, “আমরাই কিছু করতে হবে”, “মোল্লা উমরের তলোয়ার দরকার”—কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত এক দশকে কেউ কার্যকর ডেটারেন্ট গড়ে তুলতে পারেনি। ডেটারেন্স কার্যকর যখন সেটার বাস্তবতা থাকে। বাস্তবতা না থাকলে সেটা ফাঁকা বুলি। আর ফাঁকা বুলি দিয়ে আর যাই হোক কার্যকর কিছু হয় না।
সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া আক্ষরিক অর্থে আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। জনপরিসরে, পাড়া-মহল্লা ও কমিউনিটি স্তরে মুসলিম তরুণরা যদি সংগঠিত না হয়, তাহলে হিন্দুত্ববাদ, রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন বা অন্য যেকোনো সাংস্কৃতিক প্রকল্পের বিরুদ্ধেও আমাদের কিছু করার ক্ষমতা থাকবে না। আমাদের কোন ডেটারেন্স ক্যাপাসিটি থাকবে না।
বছরের পর বছর আমরা শুধু হাহুতাশ করব—কিন্তু পরিস্থিতি বদলাবে না।
আমি জানি এই কাজটা গ্ল্যামারাস না। এটাতে জযবা পাওয়া যায় না। শরীয়াহর দিক থেকেও এটা বেস্ট সমাধান না। তবে অন্য কোন কার্যকর সমাধানও আমরা দেখছি না। এ অবস্থায় নিস্ক্রিয় থাকার কিংবা স্রেফ হাহুতাশ করা কোন অপশান হতে পারে না।
পথে সালাত আদায় করার চেয়ে মসজিদে সালাত আদায় করা বেটার। কিন্তু আশেপাশে মসজিদ না থাকলে এবং ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবার উপক্রম হলে মসজিদ না থাকলেও সালাত আদায় করে নিতে হয়। মসজিদে সালাত আদায় করা উত্তম বলে, তাই বলে সালাত আদায় না করে বসে থাকা যায় না।