20/10/2026
যারা ভাবি “আমরা তো তাওহিদ বুঝে গেছি!” — এই ঘটনা আমাদের তাওহিদ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখাবে ইনশাআল্লাহ
একবার শাইখ মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর ছাত্রদের কিতাবুত তাওহিদ পড়াচ্ছিলেন।
তিনি বইটির বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করলেন, তাওহিদের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করলেন।
বইটি পড়ানো শেষ হলে তিনি আবারও সেটি পড়াতে চাইলেন—তৃতীয়বার কিংবা চতুর্থবারের মতো।
কিন্তু এবার ছাত্ররা বলল,
“হে শাইখ! আমরা এবার অন্য কোনো বই পড়তে চাই। ফিকহ কিংবা হাদিসের কোনো বই পড়তে চাই।”
শাইখ জিজ্ঞেস করলেন,
“কেন?”
ছাত্ররা উত্তর দিল,
“আমরা তো তাওহিদ বুঝে গেছি! এবার অন্য কোনো ইলম শিখতে চাই।”
শাইখ বললেন,
“ঠিক আছে, বিষয়টি নিয়ে আমাকে একটু চিন্তা করতে দাও।”
কয়েক দিন পর…
শাইখ যথারীতি দরসে এলেন। কিন্তু সেদিন তাঁর চেহারায় ছিল গভীর উদ্বেগ ও অস্বস্তির ছাপ।
ছাত্ররা তাঁকে এমন অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করল,
“হে শাইখ! আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে?”
তিনি বললেন,
“আমার কাছে এমন একটি সংবাদ পৌঁছেছে, যা আমাকে খুবই উদ্বিগ্ন করেছে।”
ছাত্ররা জানতে চাইল,
“কী সংবাদ, হে শাইখ?”
তিনি বললেন,
“আমি জানতে পেরেছি, দিরইয়াহর একটি বাড়ির লোকেরা তাদের নতুন বাড়িতে প্রবেশ করার আগে দরজার কাছে একটি মোরগ জবাই করেছে। তারা মোরগটির রক্ত বাড়ির দরজার কাছে প্রবাহিত করেছে। আমার কাছে খবর এসেছে, তারা জিনের উদ্দেশ্যে এমনটি করেছে।”
একটু থেমে তিনি আরও বললেন,
“আমি বিষয়টি যাচাই করার জন্য একজনকে পাঠিয়েছি। সত্যতা নিশ্চিত হলে এ ব্যাপারে যা কর্তব্য, তা করা হবে।”
পরের দিন…
ছাত্ররা আবারও শাইখের কাছে এল।
তাদের মনে আগের দিনের ঘটনাটি নিয়ে কৌতূহল ছিল।
তারা জানতে চাইল,
“হে শাইখ! গতকালের সেই ঘটনার কী হলো? আপনি কি বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পেরেছেন?”
শাইখ বললেন,
“আমি বিষয়টি যাচাই করে জানতে পেরেছি, ব্যাপারটি আসলে অন্য রকম।”
ছাত্ররা জিজ্ঞেস করল,
“কী জানতে পেরেছেন?”
তখন শাইখ বললেন,
“আমি জানতে পেরেছি, ওই বাড়ির লোকেরা এমন কাজ করেনি। বরং অমুক ব্যক্তি নিজের মায়ের সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে।”
কথাটি শোনামাত্র ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া বদলে গেল!
তারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে বলতে লাগল,
“আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই! নিজের মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করেছে!”
“সুবহানাল্লাহ! মানুষ এত জঘন্য কাজ কীভাবে করতে পারে!”
তাদের চেহারায় ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেল। এমন একটি পাপের কথা শুনে তারা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাল।
এবার শাইখ তাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরলেন।
তাদের এই প্রতিক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাটি বুঝিয়ে দিলেন।
তিনি বোঝালেন,
“তোমরা যখন শুনলে একজন ব্যক্তি নিজের মায়ের সঙ্গে ব্যভিচার করেছে, তখন তোমাদের অন্তর ঘৃণা ও ক্ষোভে ভরে গেল। অথচ যখন শুনলে, আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে—জিনকে সন্তুষ্ট করার জন্য—জবাই করা হয়েছে, তখন তোমাদের অন্তরে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না কেন?”
“তোমরা একটি বড় গুনাহের কথা শুনে এতটা বিচলিত হলে, অথচ আল্লাহর ইবাদতের অধিকার অন্যকে দেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধের সংবাদ তোমাদের অন্তরকে একইভাবে নাড়া দিল না কেন?”
কারণ, তোমরা বলেছিলে—‘আমরা তো তাওহিদ বুঝে গেছি!’
অথচ তোমাদের প্রতিক্রিয়াই দেখিয়ে দিল, তাওহিদের প্রকৃত গুরুত্ব এবং শিরকের ভয়াবহতা তোমরা এখনো যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারোনি।
জিনকে সন্তুষ্ট করার জন্য, তাদের কাছে নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কিংবা তাদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার আশায় ইবাদতস্বরূপ জবাই করা হলে, তা আল্লাহর ইবাদতে অন্যকে শরিক করা। এটি বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
যে অধিকার একমাত্র আল্লাহর, তা অন্য কাউকে দেওয়া—এটি কেবল একটি সাধারণ পাপ নয়; এটি তাওহিদের মূল ভিত্তির পরিপন্থী।
শাইখের এই উদাহরণের উদ্দেশ্য ছিল ছাত্রদের বোঝানো: তাওহিদ সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় জেনে নেওয়া আর তাওহিদের প্রকৃত মর্যাদা অন্তরে উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়।
📚 সূত্র: শাইখ সালিহ আলে শাইখের ‘শারহু কাশফিশ শুবুহাত’-এ উদ্ধৃত বর্ণনা থেকে।
সূরা আল-মু’মিনূন (আয়াত ৮৪–৯২)
৮৪. বলুন, ‘পৃথিবী এবং এতে যারা আছে তারা কার, যদি তোমরা জেনে থাকো?’
৮৫. তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহর!’ বলুন, ‘তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’
৮৬. বলুন, ‘সাত আসমানের রব এবং মহা-আরশের রব কে?’
৮৭. তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ!’ বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন (ভয়) করবে না?’
৮৮. বলুন, ‘কার হাতে সব কিছুর সার্বভৌম কর্তৃত্ব, যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যাঁর বিরুদ্ধে কেউ আশ্রয় দিতে পারে না, যদি তোমরা জেনে থাকো?’
৮৯. তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহর!’ বলুন, ‘তাহলে কীভাবে তোমরা জাদুগস্ত (বিভ্রান্ত) হচ্ছ?’
৯০. বরং আমি তো তাদের কাছে সত্য পৌঁছে দিয়েছি, আর তারা নিশ্চিতভাবেই মিথ্যাবাদী।
৯১. আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো উপাস্যও নেই। যদি থাকত, তবে প্রত্যেক উপাস্য তার সৃষ্টিকে নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যা রটনা করে তা থেকে আল্লাহ পরম পবিত্র।
৯২. তিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তারা যে শিরক (অংশী স্থাপন) করে তিনি তা থেকে অনেক ঊর্ধ্বে।
প্রিয় নবী ইব্রাহিম (আঃ) দোয়া করেছেন শিরক থেকে বাঁচার জন্য, যেটা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন ,
"হে আমার রব, এ শহরকে (মাক্কাকে) শান্তিময় করুন এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখুন।" (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত ৩৫)
রাসূল (সা:) শিরক থেকে বাঁচার জন্য দোয়া করেছেন '
"হে আল্লাহ! আমি জানা অবস্থায় আপনার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাইছি, আর যা আমার অজানা তা থেকে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।"
( আল-আদাবুল মুফরাদ -৭১৬ , সহীহ আত তাগরিব ৩৬)
আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ তাওহীদ এর উপর মৃত্যু দান করুক (আমিন )