10/02/2026
ব্রিটিশ শাসনামলে রৌমারী অঞ্চলের শিক্ষা ও অধ্যাপক ইমান আলীর অনন্য জীবনকথাঃ
ব্রিটিশ শাসনামলে রংপুর জেলার বর্তমানের ( কুড়িগ্রাম) জেলার রৌমারী উপজেলা মূল জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ফলে এখানে স্কুল, কলেজ কিংবা যোগ্য শিক্ষকের অভাব ছিল। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে অধিকাংশ পরিবার তাদের সন্তানদের শিক্ষা দিতে সক্ষম ছিল না। ফলে তৎকালীন সময়ে রৌমারীতে শিক্ষার হার ছিল নগণ্য এবং তা মূলত কিছু জমিদার ও সচ্ছল পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
মহর উদ্দিন মুন্সী ও শিক্ষাচেতনার সূচনাঃ
এই প্রতিকূল পরিবেশেই রৌমারী উপজেলার পূর্ব পাখিউড়া গ্রামের এক কৃষক মহর উদ্দিন মুন্সীর আবির্ভাব ঘটে। তিনি পেশায় কৃষক হলেও ছিলেন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ও সমাজসচেতন মানুষ। সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সকল সন্তান—এমনকি মেয়েদেরও—পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। পুরোপুরি সফল না হলেও তিনি তাঁর সন্তানদের স্কুলমুখী করতে সক্ষম হন, যা সে যুগে ছিল এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
মহর উদ্দিন মুন্সীর ছয় সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে ছিলেন ইমান আলী—যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের গণিত শিক্ষায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হন।
অধ্যাপক ইমান আলীর শিক্ষাজীবনঃ
ইমান আলী জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, নিজ গ্রাম পাখিউড়ায়। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের পাঠশালায়, পরে পাশের গ্রামের মক্তবে (বর্তমান টাপুর চর মক্তব মাদ্রাসা)। এলাকায় উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি পড়াশোনার উদ্দেশ্যে আসামের ধুবড়ী শহরে নানার বাড়িতে চলে যান।
ধুবড়ীর সুখচর মধ্য ইংরেজি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। ১৯৩৯ সালে আসাম মাধ্যমিক ইংরেজি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি আসাম প্রদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেন—যা ছিল এক অনন্য কৃতিত্ব।
পরবর্তীতে তিনি ধুবড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে দুই বিষয়ে লেটার নম্বরসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে)। পূর্ব বাংলার শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী।
আইএসসি পড়ার জন্য তিনি গৌহাটি কলেজে ভর্তি হন এবং সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করলেও প্রাদেশিক বৈষম্যের কারণে বৃত্তি পাননি। আর্থিক সংকটে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে না পেরে তিনি দেশে ফিরে এসে ১৯৪৫ সালে করোটিয়া সাদত কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন এবং ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে অনার্সে ভর্তি হয়ে ১৯৫০ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। এমএ পর্যায়ে আর্থিক ও মানসিক কষ্টের কারণে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণি লাভ করলেও ফলিত গণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন (১৯৫২)।
কর্মজীবন ও বুয়েটে অধ্যাপনা
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতায় যুক্ত হন। ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত গণিত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমান বুয়েট) যোগ দেন এবং সেখানকার গণিত বিভাগের প্রথম বাংলাদেশি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি বুয়েটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য বৃত্তি লাভ করলেও গুরুতর অসুস্থতার কারণে গবেষণা অসমাপ্ত রেখে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালে তিনি বুয়েট থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
গণিতসাধনার নীরব সাক্ষ্য ও ব্যক্তিজীবনঃ
অধ্যাপক ইমান আলী শ্বেতী ও ডায়াবেটিসের মতো জটিল রোগে ভুগেও শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যবান গণিত গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো—
Plane Trigonometry
Intermediate Geometry
Commercial Mathematics
Matrices and Linear Transformation
Tensor Analysis
এই গ্রন্থগুলোর সব চিত্র ও অঙ্কন নিজ হাতে এঁকেছিলেন তাঁর স্ত্রী রহিমা ইমান। তিনি তাঁর সব বই স্ত্রীকে উৎসর্গ করেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতিঃ
১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক
গণিতে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য একাধিক সম্মাননা
জগন্নাথ কলেজ থেকে বিশেষ স্বীকৃতি ও বেতনভাতা
জীবনদর্শন ও উক্তিঃ
আমার কাছে সুন্দর জীবন বলতে বোঝায়—
জ্ঞান অর্জনের নিরন্তর সাধনা,
সৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন,
এবং মহৎ কিছু করার অদম্য ইচ্ছা নিয়ে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা।
সুন্দর জীবন গঠনের জন্য আরও কিছু মৌলিক নীতি আমি বিশ্বাস করি—
সমালোচকের প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়ে নিজের দোষ-ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করা এবং নিজেকে সংশোধনের আন্তরিক চেষ্টা করা।
আলস্য পরিহার করা এবং কোনো কাজ ফেলে না রেখে সময়মতো বিশ্বস্ততার সঙ্গে প্রতিটি দায়িত্ব সম্পন্ন করা।
জ্ঞানী ও সৎ মানুষকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা; অন্যরা কেবল সহচর মাত্র।
অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ না করা।
চাটুকারিতা সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা।
বিশ্রাম বলতে কর্মবিমুখতা বোঝায় না; বরং একটি কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার পর যে আনন্দ ও তৃপ্তি পাওয়া যায়, সেটিই আমার কাছে প্রকৃত বিশ্রাম।
শেষ অধ্যায়ঃ
১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ইমান আলী ঢাকায় নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর নিজ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে সমাধিস্থ করা হয়।
অধ্যাপক ইমান আলীর জীবন প্রমাণ করে—প্রত্যন্ত ও অবহেলিত অঞ্চল থেকেও অধ্যবসায়, সততা ও জ্ঞানসাধনার মাধ্যমে একজন মানুষ জাতির গর্বে পরিণত হতে পারেন।
লেখা পাঠিয়েছেন: ফারুক আহমেদ স্বপন