27/04/2026
বৃষ্টি শুরু হলো। কুরআনে আছে বৃষ্টি আসে রহমতস্বরুপ। আর আমরা এই রহমতকে নষ্ট না বরং আতংক হিসেবে ব্যবহার করি। জানেন কি বছরে গড়ে ২,৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি (কিছু সুত্রে ২১৭৪) হয়? পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল দেশগুলোর একটি আমরা। অথচ প্রতি বছর বর্ষা শেষ হতে না হতেই শুনি পানির সংকট, ফসল নষ্ট, জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে।
-
এত পানি পেয়েও আমরা পানি ধরে রাখতে পারছি না। এটা প্রকৃতির ব্যর্থতা না। এটা আমাদের পরিকল্পনার ব্যর্থতা।
বৃষ্টি শুরুর আগেই পাঁচটা কাজ করা দরকার। এখনই।
-
এক. গাছ লাগান : কিন্তু সঠিক গাছ
গাছ লাগানোর কথা আমরা সবাই বলি। কিন্তু কোন গাছ, সেটা নিয়ে কেউ কথা বলে না।
একটি পরিণত তাল গাছ দিনে ৩০০ লিটার পর্যন্ত পানি মাটিতে টেনে নামাতে পারে। হিজল, বরুণ, কদম এই দেশীয় গাছগুলো শুধু ছায়া দেয় না, মাটির গভীরে পানির পথ তৈরি করে।
ভারতের রাজস্থানে, যেখানে বৃষ্টি বছরে মাত্র ৩০০ মিলিমিটার, সেখানে দেশীয় গাছ ও ঐতিহ্যবাহী জলসংরক্ষণ পদ্ধতি একসাথে ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৬ মিটার থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উপরে তুলে আনা হয়েছে।
-
দুই. মাটির নিচের পানির স্তর ফেরানো
BWDB-র তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন ভূগর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে প্রায় ২৩ লাখ কিউবিক মিটার পানি। ফেরত যাচ্ছে কতটুকু? নগণ্য। কারণ মাটি ঢেকে গেছে কংক্রিটে।
এক সময় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে এবং ঢাকার আশেপাশে হাজার হাজার পুকুর ছিল যা প্রাকৃতিক 'রিটেনশন রিজার্ভার' হিসেবে কাজ করত। এখন আমাদের জলাভূমি ভরাট করে ফেলার কারণে পানি যাওয়ার জায়গা পায় না।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৮৬ মিটারে নেমেছে, যা ১৯৯৬ সালের ২৫ মিটার থেকে অনেক বেশি এবং মাত্র ৩ শতাংশ জলাভূমি অবশিষ্ট আছে।
সমাধান জটিল না। রিচার্জ পিট। মাটিতে ৩ থেকে ৫ ফুট গর্ত করে বালি ও নুড়ি ভরে দিলে বৃষ্টির পানি সরাসরি ভূগর্ভে যায়। জাপানের টোকিওতে প্রতিটি নতুন ভবনে বাধ্যতামূলক রেইনওয়াটার রিচার্জ সিস্টেম আছে। রেইন ওয়াটার এবং গ্রে ওয়াটার হারভেস্টিং আমাদের ভবিষ্যত- বাধ্যতামুলক করতে হবেই।।
চীন তাদের শহরগুলোতে কংক্রিটের বদলে এমন এক ধরণের 'পারমিবল পেভমেন্ট' বা ছিদ্রযুক্ত ইট ব্যবহার করছে যা বৃষ্টির পানি শুষে নিতে পারে। আমাদের বসুন্ধরাতেও এরকম ইট বসাতে দেখেছি।।
একটি ১,০০০ বর্গফুটের ছাদ থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ লিটার পানি সংগ্রহ করা সম্ভব। সেটা মাটিতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করলেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে ফিরবে।
-
তিন. উপকূলে পানির রিজার্ভার
উপকূলীয় বাংলাদেশের মানুষের সামনে একটা নির্মম বিদ্রূপ আছে - চারদিকে পানি, তবু খাওয়ার পানি নেই। সমুদ্র লবণাক্ত, নদীর পানি লবণাক্ত, মাটির নিচেও লবণ।
উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ নলকূপের পানি লবণাক্ত হয়ে গেছে। লবণাক্ত জমির পরিমাণ গত চার দশকে প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে এবং লবণাক্ততা ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ফলে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষ এখন বিশুদ্ধ পানির জন্য দিনে ২ থেকে ৩ কিলোমিটার হাঁটে। জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রের লবণাক্ততা আরও ৪০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।
সমাধান হলো রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং রিজার্ভার। বর্ষার মিষ্টি পানি ধরে রেখে সারা বছর ব্যবহার করা। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে কিছু এনজিও এই মডেলে কাজ করছে। একটি পরিবারের জন্য ১০,০০০ লিটারের একটি ট্যাংক পুরো শুষ্ক মৌসুম পার করে দেয়। এটা জাতীয় কর্মসূচিতে নেওয়া দরকার ছিল আরও দশ বছর আগে।
অগভীর নলকূপ দিয়ে পানি তুলতে গিয়ে কৃষকের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বা ডিজেল খরচ হয়, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করলে সেই খরচ ৩০-৪০% কমিয়ে আনা সম্ভব।
-
চার. কম্পোস্টিং : মাটিকে বাঁচান
বাংলাদেশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ আদর্শ মাত্রার (৩-৫%) অনেক নিচে - প্রায় ১% বা তারও কম (কিছু এলাকায় ০.৯% পর্যন্ত)। মাটি দুর্বল মানে মাটি পানি ধরে রাখতে পারছে না, বন্যায় ভেসে যাচ্ছে, খরায় ফেটে যাচ্ছে।
একটা সুস্থ মাটি তার ওজনের ২০ শতাংশ পর্যন্ত পানি ধরে রাখতে পারে। সেই মাটি তৈরি হয় কম্পোস্ট থেকে। আর কম্পোস্টিং এর সময় এখনি। মাটির স্বাস্থ্য ফেরাতে বৃষ্টির পানি এবং জৈব সারের (কম্পোস্ট) যে যুগলবন্দী, তা ফসলের ফলন ২০% পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রতিটি পরিবার যদি রান্নাঘরের বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করে, সেটা শুধু মাটির জন্য না, ল্যান্ডফিলের চাপও কমায়। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬,০০০ টন বর্জ্য তৈরি হয়, যার ৭০ শতাংশই জৈব এবং কম্পোস্টযোগ্য। সেটা এখন যাচ্ছে মাটিতে পুঁতে। বিষ তৈরি করছে, কম্পোস্ট না।
-
পাঁচ. জলাবদ্ধতা : ড্রেন নয়, ভাবুন ভিন্নভাবে
ঢাকায় এক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হলেই হাঁটু পানি। কেন? কারণ ১৯৭০-এর দশকে ঢাকার যে ৪৭ থেকে ৬৫টি প্রধান খাল ছিল, তার বেশিরভাগ এখন দখল হয়ে গেছে বা ভরাট হয়ে গেছে। পানি বের হওয়ার পথ নেই।
প্রতি বছর একই চিত্র- বৃষ্টি শুরু, তারপর খাল ড্রেন পরিষ্কার করার উদ্যোগ।
এটা উল্টো হওয়া উচিত। বর্ষা শুরুর আগেই সব খাল, ড্রেন, নালা পরিষ্কার না করলে পানি নামার পথ বন্ধ থাকবে, যত বড় ড্রেনই বানান, কাজ হবে না।
ড্রেন বড় করলেই সমস্যা সমাধান হয় না। কারণ পানির গন্তব্য দরকার। সেটা হতে পারে পুনরুদ্ধার করা খাল, শহরের ভেতরে ছোট জলাধার, পার্কের নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড রিটেনশন ট্যাংক।
টোকিওতে ভূগর্ভে একটি বিশাল পানি ব্যবস্থাপনা সুড়ঙ্গ আছে - যা শহরকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখে। আমাদের শহরে সেই বিনিয়োগ নেই। কিন্তু ছোট পরিসরে খাল পুনরুদ্ধার এবং নগর জলাধার তৈরি করা এখনও সম্ভব - যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে।
বর্ষা আমাদের সমস্যা না- বর্ষা আমাদের সুযোগ।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই কয়েক মাসের পানিটা ধরে রাখতে পারব, নাকি আগের মতোই চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখব?