11/08/2025
তোমরা যারা ভার্সিটিতে #ভর্তি হয়েছো কিংবা সামনে ভর্তি হবে, সবার উদ্দেশ্যে জরুরী কিছু কথা বলতে চাই।
এসব কথা মাথায় রেখো, মনে রেখো। কাজে দিবে, শতভাগ নিশ্চিত থেকো।
#আমরা ভর্তি হওয়ার পর কেউ এরকম কিছু বললে অনেক কাজে আসতো। ভার্সিটি লাইফটা হয়তো আরো অনেক সহজ হতো। অনেক কিছু পরিকল্পনা মাফিক গুছিয়ে নেয়া যেতো।
#তবে ওসময় তো আর ফেসবুক আসেনি, তাই তেমন কিছু শুনিনি। প্রায় অন্ধকারে ছিলাম। ঠেকে ঠেকে সব শিখতে হয়েছে। তোমরা ও এভাবে ঠেকে ঠেকে শিখো, সেটা চাইনা বলেই এসব বলা।
#প্রথম থেকেই পড়াশুনায় সিরিয়াস থেকো। পড়াশুনা কিন্তু সিরিয়াস, খুবই সিরিয়াস একটি বিষয়। এটা নিয়ে হেলাফেলা করলে ধরা খাবে, জন্মের মতো ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর ফার্স্ট ইয়ারে পিছিয়ে পড়লে, ভালো জিপিএ না আসলে --- ঐ ধাক্কা কাটিয়ে উঠা কঠিন, খুবই কঠিন। আর ফার্স্ট ইয়ার থেকেই ভালো রেজাল্ট করতে পারলে তোমার মধ্যে যে স্পিরিট আসবে -- সেটাই তোমাকে অন্য সবার চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে দিবে। তখন তোমার কাজ হবে শুধু ঐ স্পিরিট আর মোটিভেশনটা ধরে রাখা।
#পড়াশুনা বিষয়টি কিন্তু ইন্টারেস্টিং। তুমি একবার মজা পেলে আরো পড়তে ইচ্ছে হবে। বেশি পড়লে আরো মজা পাবে। সবকিছু খুব সহজ মনে হবে। পড়াশুনার জগতটা আরও ভালো লাগবে। আনন্দময় একটা ভুবনে তুমি বসবাস করবে। এর বিপরীতটাও সত্য। খুবই সত্য।
#ইংরেজী ভাষার উপর একটা দখল তৈরী করো। রাইটিং, স্পোকেন দু'টোতেই ভালো দখল তৈরী করো। আজীবন কাজে দিবে।
#নিয়মিত ক্লাস করো। হুদাই বাসায়, হলে, মেসে শুয়ে বসে কাটানোর চেয়ে ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় ঘুরলেও অনেক লাভ। কোন কারণে ক্লাস না হলে বন্ধু বান্ধবদের সাথে এমনকি গল্প করে সময় কাটালেও অনেক কিছু শেখা যাবে।
#ভার্সিটিতে যিনি পড়ান, তিনিই প্রশ্ন করেন, তিনিই আবার খাতা দেখেন। ফলে নিয়মিত ক্লাস করলে ভালো রেজাল্ট করা অপেক্ষাকৃত সহজ। কোন ক্লাস করতে না পারলে ক্লাস নোটটা কালেক্ট করো। ক্লাস লেকচার, রেফারেন্স বই আর সিনিয়রদের নোট মিলিয়ে নিজের নোট নিজেই তৈরি করো। অথবা কয়েকজন ক্লাসমেট মিলে কোর্স গুলো ভাগ করে নিয়ে নোট করো। এরপর নিজেদের মধ্যে শেয়ার করো। এটা করতে পারলে তুমি অনেকখানি এগিয়ে গেলে। এরপর নিয়মিত পড়াশুনা করলে ভার্সিটিতে খারাপ রেজাল্ট করাই বরং কঠিন। ভালো করা নিশ্চিত, ইনশাআল্লাহ।
#অনেকে প্রথমে ভার্সিটির পড়াশুনার সিস্টেম ধরতে পারেনা। সিস্টেম বুঝার আগেই ফার্স্ট ইয়ার ফাইনালে খারাপ করে বসে থাকে। অনেকে ডিপ্রেশনে চলে যায়। ভার্সিটি, ডিপার্টমেন্ট, পড়াশুনা --- সবকিছুর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই সিনিয়র কারো কাছ থেকে প্রথমেই সিস্টেম বুঝে নেয়া উত্তম।
#কিছু স্কিল ডেভেলপ করার জন্য ভার্সিটি ভালো জায়গা। কিছু এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে যুক্ত হও। বিতর্ক করো, ক্যারিয়ার ক্লাব করো, সায়েন্স ক্লাব ইত্যাদিতে যোগ দাও। বিভিন্ন কম্পিটিশনে অংশগ্রহণ করো। দেশ বিদেশের
অনলাইন / অফলাইন বিভিন্ন কোর্স, ট্রেনিং, ওয়ার্কশপ, ইন্টার্নশিপ সহ যেকোন সুযোগ লুফে নাও।
#যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াও। কানেক্টিভিটি বাড়াও।
ভালো জিপিএ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ বলতে বললে সেটা অবশ্যই এই যোগাযোগ দক্ষতা। ভবিষ্যতে স্কলারশিপ, চাকুরী পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা দারুণ কাজে দিবে।
#সুযোগ পেলেই বক্তব্য দিবে। সেটা যে পরিসরেই হোক। প্রথম প্রথম ভয় লাগবে, জড়তা কাজ করবে। তবে একটু সাহস করে বক্তব্য দেয়া শুরু করো, একসময় দেখবে বাসার ড্রইং রুমে বসে গল্প করা আর বক্তব্য দেয়া সমান সহজ। দেখবে তোমার বলার মতো অনেক কিছু আছে। সেসব বলতে পারলে নিজের মধ্যে এক ধরণের আনন্দ অনুভব করবে। দারুণ একটি অনুভূতি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই একটা স্কিল তোমার আজীবন কাজে আসবে, তোমাকে অনেক দূর এগিয়ে দিবে। নিজেকে তোমার বসের সামনে কিংবা সবার সামনে আলাদা করে প্রেজেন্ট করার এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কি আছে?
#প্রেজেন্টেশন স্কিল বাড়াও। এটা আজীবন কাজে আসবে।
#তোমরা কিছু কাজ করতে পারো। টিউশন হোক, ফ্রী ল্যান্সিং হোক, পার্ট টাইম জব হোক--- যেভাবে হোক সৎ ভাবে কিছু আয় রোজগার এখন থেকেই করতে পারো-- করা উচিত। এমনকি তুমি সচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসলেও নিজে কিছু আয় করো। এটা তোমাকে অর্থের মূল্য শেখাবে। আর কখনো পারিবারিকভাবে কোন বিপর্যয়ে পড়লে সামাল দেয়া সহজ হবে। আর টিউশন সহ এসব কর্মকাণ্ড তোমাকে ভবিষ্যতে জব মার্কেটের জন্য অনেক সাহায্য করবে।
তাছাড়া ভালো, প্রোডাক্টিভ কাজে ব্যস্ত থাকলে তুমি খারাপ কিছু করার কিংবা ভাববার সময় পাবেনা।
আর এই বয়সে এসে কয়েকজন বন্ধু মিলে একদিন রেস্টুরেন্টে খাবে কিংবা কোথাও ঘুরতে যাবে --- এখন সেই টাকাও যদি বাবা-মা'র কাছ থেকে নিতে হয় সেটি খুবই লজ্জার, তাই না?
#আরেকটি বিষয়, এখন থেকেই ভাবো -- ভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হওয়ার সময় তোমার সিভিটা কেমন দেখতে চাও। আর সেভাবেই কাজ করো, নিজের ঘাটতি গুলো পূরণ করো। প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখো। নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাও, নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাও। তাছাড়া, সিভি হুট করে লেখার কোন বিষয় নয়, এটি সাধনার বিষয়। এটা ধাপে ধাপে তৈরী করার বিষয়। আর নিজেকে সেভাবে তেরী করার জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর নেই।
#সুযোগ পেলে তোমার কোন স্যার/ ম্যাডামের কোন গবেষণা প্রজেক্টে যুক্ত হয়ে নাও। কিছু আর্টিকেল পাবলিশ করো। ভালো জিপিএ আর কিছু আর্টিকেল থাকলে পাশ করা মাত্র খুব সহজেই স্কলারশিপ ম্যানেজ করে বাইরে যেতে পারবে।
#লাস্ট বাট নট লিস্ট, চাইলে তুমি এই চার বছর শুয়ে বসে ঘুমিয়ে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিতে পারো। এখানে তুমি স্বাধীন, তোমাকে বলার কেউই নেই। তুমি চাইলে সারা রাত চিল করতে পারো, লেডিস হলের সামনে হুদাই ঘুরঘুর করতে পারো আবার চাইলে সারারাত পড়তেও পারো।
আর #নষ্ট, একেবারে নষ্ট (সব অর্থেই) হওয়ার সব উপাদান ভার্সিটিতে আছে। বিপুল পরিমাণে আছে। পরিবেশ তো আছেই। আবার ভালো হওয়ার, ভালো কিছু করার মতো সবকিছু ও ভার্সিটিতে আছে। চয়েজ ইজ ইউরস!
এখন তুমি এই সময়টার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য তৈরী করবে, নাকি চিল/ ফান/ মাস্তি মুডেই চার/পাঁচ বছর কাটিয়ে দিবে -- সেটা একান্তই তোমার সিদ্ধান্ত।
#চার/ পাঁচ বছর চিল/ ফান/ মাস্তি করে কাটিয়ে আজীবন একটা গ্লানিকর জীবন পার করার রিস্ক নিবে নাকি এই সময় ভালো পড়াশুনা করে নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যেখানে তোমাকে কেউই আটকাতে পারবেনা-- সে সিদ্ধান্ত একান্তই তোমার। এই সময়টা ঠিকঠাক কাজে লাগালে তুমি ভালো করবেই। সুনিশ্চিত থেকো। একটু ঝড় ঝাপ্টা হয়তো আসবে, তবে দিনশেষে তুমি ভালো করবেই। আর নিশ্চিত ভবিষ্যত এবং সবার সামনে বুক ফুলিয়ে চলতে পারবে,
জগতে এটা কে না চায় বলো? আর মনে রেখো, পরিশ্রম কখনো বৃথা যায়না। রিটার্ন দিবেই, সুদে-আসলে দিবে।
এখন বাকী সিদ্বান্ত তোমার। এই চার-পাঁচ বছরই তোমার বাকী জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে দিবে।
#পুনশ্চ
অভিভাবকদের উচিত আপনার সন্তান কি করে, কার সাথে মিশে, পড়াশুনার কি অবস্থা ইত্যাদির নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা। আর সন্তানের ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। সম্ভব হলে নিজে ডিপার্টমেন্টে, হলে, মেসে এসে মাঝে মাঝে দেখে যাওয়া, কথা বলা।
#ইদানীং কেউ কেউ বলে জিপিএ ম্যাটার করেনা। এত পড়াশুনা করে কোন লাভ নেই।
বাস্তবতা হলো, ভালো জিপিএ না থাকলে তুমি অনেক জায়গায় এপ্লাই ও করতে পারবেনা। সুযোগ পাওয়া তো অনেক দূরের বিষয়।
আর #জিপিএ খারাপ হলে সেটা কাভার দেয়ার জন্য তোমাকে কত কিছু করতে হবে, কতকিছু বলতে হবে। কী দরকার? অথচ জিপিএ ভালো হলে এসব এক্সট্রা কোয়ালিটি তোমাকে কতদূর নিয়ে যেতো ভেবে দেখেছো?
তাই "জিপিএ ম্যাটার করেনা" "এত পড়াশুনা করে কি লাভ"
এসব ফালতু আলাপ জীবনে ও বিশ্বাস করবেনা। তুমি খুবই ধনী কিংবা খুবই প্রভাবশালী কারো আত্নীয় স্বজন হলে হয়তো পার পেয়ে যেতে পারো।
তবে মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসলে এসব কথা ঘুণাক্ষরেও বিশ্বাস করবেনা। এই পড়াশুনাই তোমার, তোমার পরিবারের একমাত্র সম্বল। উপরে উঠার একমাত্র সিঁড়ি। একমাত্র মই। এটাকেই ধ্যান জ্ঞান করো।
আর পরিশ্রমের কোন বিকল্প নেই। তুমি হয়তো মেধাবী কিন্তু পরিশ্রমী নও তাহলে তুমি খুব বেশি দূর এগুতে পারবেনা।
আবার তুমি মোটামুটি মেধাবী তবে পরিশ্রমী, খুবই পরিশ্রমী--- তাহলে তোমাকে কেউই আটকে রাখতে পারবেনা। তুমি সফল হবেই, ইনশাআল্লাহ।
ভাগ্যের চেয়ে আমরা প্রায়শই নিজেদের দোষেই বেশী ভোগী।
ভাগ্যের বড় একটা অংশ আমরা তো নিজেরাই লিখি!
.....................................................
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ রেজওয়ানুল হক
প্রো-ভিসি
নোবিপ্রবি।