29/08/2025
শুনলাম একজন বলছেন যে, গাড়ির সমস্যা হলে ধোলাই খাল যান দেখবেন ১০-১২ বছরের একটা ছেলে ১০ মিনিট এদিক সেদিক করে নাকি বলে ফেলবে আপনার গাড়ির কি কি সমস্যা। কিন্তু সেটা বুয়েটের ইলেকট্রিকাল অথবা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে নিয়ে গেলে নাকি তারা বোকার মত, বলদের মত তাকাইয়া থাকবে। তারা নাকি বলবে ভাই এইটা কি জিনিস? আরও বলবে তাদেরতো এইটা এখনো পড়ায়নি, নেক্সট সেমিস্টারে বা ফোর্থ সেমিস্টারে পড়াবে ইত্যাদি।
শুনেন আপনারা যারা এমন ভাবেন তারা মেকানিক অথবা টেকনিসিয়ান আর ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে পার্থক্য বুঝেন না। শুধু ধোলাই খাল কেন আপনি নীলক্ষেত বা এলিফ্যান্ট রোডে যান এমন অনেক স্কিলড ছেলেপেলে পাবেন যাদের কাজ কর্ম দেখলে আপনি আশ্চর্য় হয়ে যাবেন। ওদের কাজের মূল্য আছে। সমস্যা কি জানেন? ওরা একই কাজ দেখতে দেখতে, করতে করতে মুখস্ত করে ফেলে। এইটাকে বলে স্কিল। এইটা জ্ঞান না। এখন ধোলাই খালের ১২ বছরের ছেলে গাড়ির সমস্যা ১০ মিনিট ঘেটেঘুটে বলতে পারে বলে বিশ্বসেরা গাড়ির কোম্পানি তাকে ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে বিশাল বেতনে চাকুরী দিবে না বা এমআইটি, ক্যালটেক তাকে পিএইচডি করতে টিচিং বা রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দিবে না।
যিনি বলেছেন তিনি ২৪এর গণ অভ্যুথানের পর উদয় হওয়া বড় রাজনীতিবিদ। হয়তবা আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কেউ হবেন। উনি যদি এমন ভাবেন তাহলে এই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি মারাত্মকভাবে শংকিত। উনার কথার মাধ্যমে মনে হচ্ছে যেন বুয়েটে পড়ে গরু গাঁধা তৈরী হচ্ছে। উনার হয়ত আরও মনে হতে পারে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও একইরকম বলদ তৈরী হচ্ছে। যেই পরিমান অর্থ বাংলাদেশের শিক্ষায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তারপরেও যে দেশ কিছু বিশ্বমানের স্কলার তৈরী করছে এইটাই আশ্চর্যের। আমার সাথে থিসিস করে বা গবেষণা করেছে এমন ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী এখন আমেরিকায়। আর শ্রেণিকক্ষে পড়িয়েছি এমন শিক্ষার্থী ধরলে এই সংখ্যা বিশাল। এদেরকে যদি ফিরিয়ে আনা যেত তাহলে দেশের অবস্থা এমন হতো না।
একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন বুয়েট থেকে পাশ করে প্রতিবছর কত জন ছাত্রছাত্রী বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের সমস্ত খরচাদি দিয়ে নিয়ে যায়। কেন নেয়? তারাতো দেখে না শিক্ষার্থীটা ১০ মিনিটে গাড়ির সমস্যা বলে দিতে পারে কিনা। যেই দেশের একজন শিক্ষিত মানুষ বুয়েট সম্মন্ধে এমন ধারণা পোষণ করে সেই দেশ কিভাবে সামনে আগাবে। কারণ উনার মত মানুষেরাই নির্ধারণ করবে শিক্ষায় বরাদ্দ কত হবে, গবেষণায় বরাদ্দ কত হবে? শিক্ষকদের বেতন কেমন হওয়া উচিত। প্লিজ জ্ঞান এবং স্কিলের পার্থক্য আগে জানুন এবং শিখুন। গতকালকেই এইটা নিয়ে লিখেছিলাম।
বুয়েট কেমন মানুষ তৈরী করেছে? বুয়েট তৈরী করেছে এফ আর খান। তাঁর দূরদর্শিতা, সৃজনশীল নকশা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা তাকে বাংলাদেশে স্থাপত্যের ক্ষেত্রে একটি কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁকে প্রায়শই “স্থাপত্যের আইনস্টাইন” বলা হয়, কারণ তিনি জটিল স্থাপত্য নকশায় বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও শিল্পের নিখুঁত সমন্বয় দেখিয়েছেন। বুয়েট তৈরী করেছে ফাজলে হুসাইন। তিনি ফ্লুইড ডাইনামিক্সের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিখ্যাত গবেষক। তরল প্রবাহ এবং জটিল ফ্লুইড সমস্যার গবেষণায় তাঁর অবদান অসাধারণ। বুয়েট সায়িফ সালাহউদ্দিনের মত প্রতিভাবান বিজ্ঞানী তৈরী করেছে যিনি আজ Caltech-এর ফ্যাকাল্টি এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক। এইরকম আরও অসংখ্য নাম নেওয়া যাবে যারা বিশ্বের নামিদামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি। এরা জ্ঞানের ফ্রন্টিয়ার দেয়ালকে সামনে নিয়ে যায়। যাদের নাম এখানে নিলাম তারা দক্ষতার চেয়ে জ্ঞানের জন্য বেশি বিখ্যাত।
বুয়েট থেকে পাশ করে অসংখ্য শিক্ষার্থী গুগল, ইন্টেলসহ বিশ্বের নানা বড় বড় কোম্পানিতে চাকুরী করছে। আপনাদের মত মানসিকতার মানুষদের জন্যই আমাদের দেশের মেধাবীরা দলে দলে দেশ ছাড়ছে। মেধাবীদের মূল্যায়ন না করলে মেধাবীরা থাকবে কেন?
©
Kamrul Hassan Mamun
Professor
Department of Physics
University of Dhaka