19/10/2026
কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, তবু আমরা হারিয়ে যাইনি...
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী শাহীন কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষকদের স্মৃতির পাতায়...
🌷🌼🌻🌹🌺🌹🌼🌻🌹🌺
কিছু ছবি শুধু ছবি নয়—কিছু ছবি বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক টুকরো জীবন। পুরোনো অ্যালবামের পাতা থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে তারা আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় এমন এক দরজার সামনে, যার ওপাশে পড়ে আছে আমাদের সোনালি দিন, চেনা মুখ, প্রিয় কণ্ঠস্বর আর একমুঠো দুরন্ত সময়।
মান্না দের সেই কালজয়ী গান— “কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই”—বাজতে থাকলে মনে হয়, এ যেন আমাদেরই গল্প! শুধু কফি হাউসের বদলে আমাদের আড্ডার ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনী শাহীন কলেজ। শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, করিডর, অবসরের ফাঁকে জমে ওঠা গল্প—সব মিলিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছিল এমন এক অদৃশ্য সংসার, যার বন্ধন চাকরির পরিচয় ছাপিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল হৃদয়ের গভীরে।
নিচের ছবিটার দিকে তাকালে কত কথাই না মনে পড়ে!
আলি ভাই আজ কানাডাপ্রবাসী। হাজার মাইল দূরের সেই দেশে তাঁর দিন কাটে, অথচ এই ছবির ফ্রেমে তিনি এখনো আমাদের কত কাছের! দূরত্ব মানুষকে আলাদা করে, কিন্তু কিছু সম্পর্কের কাছে আটলান্টিকও বড় বাধা হতে পারে না।
মাঝখানে বসে আছেন আমাদের মহিউদ্দিন স্যার। বার্ধক্য আজ তাঁর শরীরে নিজের ছাপ রেখেছে। সময়ের কাছে আমাদের সবারই একদিন নত হতে হয়। যে মানুষটিকে একসময় কর্মব্যস্ত দিনের মধ্যে দেখেছি, আজ তাঁর এই বয়সের কথা ভাবলে বুকের ভেতর কেমন যেন করে ওঠে। ইচ্ছে হয়, সময়ের হাত ধরে বলি—স্যার, আর একটু ধীরে চলুন! আমাদের স্মৃতিগুলো এখনো আপনার সেই চিরচেনা রূপটাকেই আঁকড়ে ধরে আছে।
ইনতেখাব স্যার বহু আগেই শাহীন কলেজ ছেড়ে প্রেসিডেন্সি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রনদেব এখন হাঙ্গেরিতে। ভৌগোলিক মানচিত্রে আমরা কত দূরে সরে গেছি! অথচ স্মৃতির মানচিত্রে আজও সবাই পাশাপাশি বসে আছি—এই ছবির মতোই।
অধ্যক্ষ মরহুম নাছির স্যারের কথা ভুলি কি করে!(ছবিতে নেই) প্রচন্ড ধাপটে, পরম স্নেহে, চিরসবুজ সিপাহসালার ভিপি সাঈদ স্যারকে নিয়ে দীর্ঘ ৩৩ বছর(অধ্যক্ষ হিসেবে রেকর্ড ১৩ বছর)
সন্তানের মতো শাহীন কলেজ চট্টগ্রামকে আগলে রেখেছিলেন। মনে পড়ে আজ অনজন স্যার,ফারুকী স্যার,রিফাত আরা ম্যাডাম,নাসরিন ম্যাডাম,দিলরুবা ম্যাডাম,তৃপ্তি ম্যাডাম,রওশন ম্যাডাম,ড. অনিমেষ দার কথা ।
আর ছবির মাঝখানে আমাদের প্রিয় বিমল স্যার! অবসরের জীবন ভালোই কাটছে তাঁর। এটা ভেবেই ভালো লাগে। যাঁদের কাছ থেকে আমরা শিখেছি, যাঁদের সঙ্গে পথ চলেছি, জীবনের শেষ প্রান্তে তাঁদের মুখে প্রশান্তির হাসি দেখতে পাওয়াও এক ধরনের পরম প্রাপ্তি।
কী অদ্ভুত নিয়তি! একসময় আমরা পাশাপাশি ছিলাম, অথচ ছবিতে আমার মুখটাই ঠিকমতো দেখা যায় না। আজ মনে হয়, জীবনের গল্পটাও বুঝি এমনই—কেউ সামনে থাকে, কেউ আড়ালে; কেউ দেশ ছেড়ে চলে যায়, কেউ অবসরে যায়, কেউ বার্ধক্যের ভারে ধীর হয়ে আসে। আর আমরা প্রত্যেকে নিজের অজান্তেই একটু একটু করে অতীত হয়ে যাই।
কখন যে আমাদের সেই ব্যস্ত দিনগুলো স্মৃতি হয়ে গেল, কখন যে সহকর্মীরা হয়ে উঠলেন জীবনের অমূল্য সম্পদ, কখন যে আড্ডার মানুষগুলোকে আবার একসঙ্গে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এত গভীর হলো—তা বুঝতেই পারিনি।
আজ হয়তো আগের মতো সবাইকে এক টেবিলে বসানো যাবে না। হয়তো আগের মতো প্রাণখোলা হাসি, তর্ক, ঠাট্টা কিংবা দীর্ঘ আড্ডাও জমবে না। কারও শরীর সায় দেবে না, কারও ঠিকানা হবে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে, কারও জীবনের ব্যস্ততা ফুরিয়ে যাবে অবসরের নীরবতায়। তবু মন বড় অবুঝ! সে এখনো বিশ্বাস করতে চায়, কোনো এক বিকেলে হঠাৎ সবাই এসে হাজির হবে। আবার জমবে সেই পুরোনো আড্ডা। কেউ চা এগিয়ে দেবেন, কেউ পুরোনো গল্পের ঝুলি খুলবেন, কেউ হেসে উঠবেন আগের মতোই।
শাহীন কলেজ আমাদের শুধু সহকর্মী দেয়নি; দিয়েছে এক টুকরো পরিবার। সেই পরিবারের কেউ আজ কানাডায়, কেউ হাঙ্গেরিতে, কেউ অন্য প্রতিষ্ঠানে, কেউ অবসরের প্রশান্তিতে, কেউ বার্ধক্যের সঙ্গে লড়াই করছেন। আর আমরা যে যেখানে আছি, বুকের গোপন কোনো কুঠুরিতে বয়ে বেড়াচ্ছি একই আকাশের নিচে কাটানো সেই দিনগুলোর স্মৃতি।
প্রিয় সহকর্মীরা, সময় আমাদের বয়স বাড়িয়েছে, ঠিকানা বদলেছে, আলাদা পথে নিয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের সেই দিনগুলো কেড়ে নিতে পারেনি।
যদি কোনো একদিন এই ছবির মানুষগুলো আবার একসঙ্গে বসতে পারি, তবে সেদিন দয়া করে কেউ ঘড়ি দেখবেন না। কেউ তাড়াহুড়ো করবেন না। পুরোনো গল্পগুলো আবার বলবেন, একই কথা বারবার বলবেন, প্রাণ খুলে হাসবেন। কারণ কে জানে, সেই বিকেলটাই হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিকেল হয়ে থাকবে।
আর যদি কোনো দিন আর একসঙ্গে বসা না-ও হয়, তবু এই ছবিটা থাকুক। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সাক্ষী হয়ে থাকুক—একসময় কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা সহকর্মী হয়েও আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিলেন।
ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আমি(এডমিন) আজও সেই আড্ডারই একজন। মুখ দেখা যায় না, কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই ছবির প্রতিটি মুখের জন্য আমার বুকের ভেতর আলাদা আলাদা জায়গা আছে।
কফি হাউসের সেই আড্ডাটা হয়তো আর নেই। শাহীন কলেজের সেই দিনগুলোও আর নেই।
কিন্তু আপনারা আছেন—আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের মায়ায়, আমাদের জীবনের গল্পে।
আর যত দিন স্মৃতি থাকবে, তত দিন আমাদের সেই আড্ডা কখনোই পুরোপুরি শেষ হবে না।
ভালো থাকুন, প্রিয় মানুষগুলো। দূরে থাকুন, তবু হৃদয়ের কাছে থাকুন। জীবনের শেষ বিকেলেও যেন মনে পড়ে—একদিন আমরা একসঙ্গে ছিলাম। আর সেই একসঙ্গে থাকাটুকুই ছিল আমাদের জীবনের এক অপূর্ব প্রাপ্তি। ❤️❤️