10/03/2026
েকাফ
এ'তেকাফ আরবি শব্দ৷ এ'তেকাফ শব্দের অর্থ হলো- বসে থাকা, অবস্থান করা, বিশ্রাম করা, সাধনা করা ইত্যাদি।
শরয়ী পরিভাষায় এ'তেকাফ অর্থ রমযানের শেষ দশকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রক্ষা করে পুরুষরা আল্লাহর ঘর মসজিদে আর মহিলারা বাসা বাড়ির নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা।
রমযানের রোযার যত হক নষ্ট হয়েছে, যত ত্রুটি-বিচ্যুতি ও গাফলত হয়েছে তা সংশোধন করার জন্য এবং রমযানের কল্যাণ ও বরকত পরিপূর্ণ হাসিল করার জন্য এ'তেকাফ হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
এ'তেকাফ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য একটি শেষ সুযোগ যাতে সে রমযানের সমস্ত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।
এ'তেকাফ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য সরকারি দাওয়াত, যেন বান্দা দশদিন তার বাড়িতে সরকারি (জান্নাতি) মেহমান রূপে বেড়িয়ে যায়।
েকাফের_মর্যাদা_ও_শান :
এ'তেকাফ যেহেতু একটি মসজিদভিত্তিক এবাদত। তাই ধরে নেওয়া যায় যেদিন থেকে আল্লাহর ঘর নির্মিত হয়েছে, সেদিন থেকেই অদ্যবধি তার মাহবুব বান্দারা তারই ঘরের মেহমান হয়ে তার তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করে চলেছেন। রব্বে কারিম মসজিদ নির্মাণের উদ্দেশ্য আদর্শ বর্ণনা করে সুরা বাকারার
১২৫ নং আয়াতে জাতির পিতা ইব্রাহিম আলাইহিস সালাতু ওয়াত তাসলিমকে বললেন,
وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ.
আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, এ'তেকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র করো।
এ'তেকাফের মাধ্যমে লাইলাতুল ক্বদর নসিব হওয়ার অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আর লাইলাতুল কদরের আশায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে রমযানের প্রথম দশদিন এ'তেকাফ করেছেন৷ আত:পর দ্বিতীয় দশদিন এ'তেকাফ করেছেন৷ অত:পর স্বপ্নে তাকে জানানো হলো যে, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে রয়েছে৷
হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
إِنِّي اعْتَكَفْتُ الْعَشْرَ الأَوَّلَ أَلْتَمِسُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ ، ثُمَّ اعْتَكَفْتُ الْعَشْرَ الأَوْسَطَ ، ثُمَّ أُتِيتُ فَقِيلَ لِي : إِنَّهَا فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ ، فَمَنْ أَحَبَّ مِنْكُمْ أَنْ يَعْتَكِفَ فَلْيَعْتَكِفْ ، فَاعْتَكَفَ النَّاسُ مَعَهُ
আমি প্রথম দশদিন এ'তেকাফ করেছি- এই রাতের (লাইলাতুল ক্দরের) খোঁজে, এরপর মাঝের দশ দিন এ'তেকাফ করেছি। এরপর আমাকে বলা হল, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে। সুতরাং আপনাদের মধ্যে যার ইচ্ছা হয় তিনি এ'তেকাফ করুন। তখন লোকেরা তাঁর সাথে এ'তেকাফ চালিয়ে গেল।
এ'তেকাফের মর্যাদা বোঝানোর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে,
আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং নিজে শেষ দশকে এ'তেকাফ করার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। শুধু তাই নয়! তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণও এ'তেকাফ করতেন এবং তাঁর সাহাবীরাও এ'তেকাফ করতেন৷ আর উম্মতকে তিনি এ'তেকাফ করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতেন।
যেমন হাদীস শরীফে বর্নিত হয়েছে,
عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ فَسَافَرَ عَامًا فَلَمَّا كَانَ مِنْ الْعَامِ الْمُقْبِلِ اعْتَكَفَ عِشْرِينَ يَوْمًا.
হযরত উবাই বিন কা’ব রা. থেকে বর্ণিত৷ হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর রমাযানের শেষ দশ দিন এ'তেকাফ করতেন। তবে তিনি কোন এক বছর রমযানে সফরে অতিবাহিত করেন। এরপর পরবর্তী বছর তিনি বিশ দিন এ'তেকাফ করেন।
(সুনানে ইবনে মাজাহ-১৭৭০)
হাদীস শরীফে আরও বর্নিত হয়েছে-
وَعَنْ عَائِشَةَ: أَنَّ النَّبِىَّ ﷺ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتّٰى تَوَفَّاهُ اللّٰهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُه مِنْ بَعْدِه. (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত৷ তিনি বলেন, হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সবসময়ই রমযান মাসের শেষ দশদিন এ'তেকাফ করেছেন৷ তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীগণও এ'তেকাফ করেছেন।
(সহিহ বুখারী-২০২৬)
আর ওয়াফাতপূর্ব বছরে তো তিনি বিশদিন এ'তেকাফ করেছেন।
হাদীস শরীফে বর্নিত হয়েছে,
وَكَانَ يَعْتَكِفُ كُلّ عَامٍ عَشْرًا، فَاعْتَكَفَ عِشْرِينَ فِي العَامِ الّذِي قُبِضَ فِيهِ.
নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি বছর দশ দিন এ'তেকাফ করতেন। কিন্তু ইন্তেকালের বছর তিনি বিশ দিন এ'তেকাফ করেছেন৷ (সহিহ বুখারী- ৪৯৯৮)
এই সময় তিনি ইবাদতের তরে এত বেশি মেহনত করতেন যে, যা অন্য কখনো করতেন না।
আয়েশা রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِى غَيْرِهِ.
রাসূল স.রমযানের শেষ দশকে (ইবাদত-বন্দেগীতে) যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন অন্যসময়ে তা করতেন না।
(সহিহ মুসলিম -১/৩৭২)
সারারাত জেগে থাকতেন আপন পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন।
হাদীস শরিফে ইরশাদ হয়েছে,
عن عائشة رضي الله عنها قالت كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا دخل العشر أحيا الليل وأيقظ أهله وجد وشد المئزر.
আম্মাজান আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমযানের শেষ দশক আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারারাত জেগে থাকতেন ও নিজ পরিবারের লোকদেরকে ঘুম থেকে জাগাতে এবং তিনি নিজেও এবাদতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। (সহিহ মুসলিম -২৬৫৪)
#এতেকাফের_ফজিলত :
হাদিস শরিফে এসেছে,
ইবনে আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ স.এ'তেকাফকাফকারীর ব্যাপারে বলেছেন,
هُوَ يَعْكِفُ الذُّنُوبَ ، وَيُجْرَى لَهُ مِنْ الْحَسَنَاتِ كَعَامِلِ الْحَسَنَاتِ كُلِّهَا.
এ'তেকাফকারী গুনাহকে প্রতিরোধ করেন। এ'তেকাফকারীকে সকল নেক আমলকারীর ন্যায় নেকি দেয়া হবে। (ইবনে মাজাহ- ১৭৮১)
অন্য আরেকটি হাদীসে এসেছে,
ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ স. বলেছেন,
مَنِ اعْتَكَفَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ جَعَلَ اللَّهُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ النَّارِ ثَلاثَ خَنَادِقَ ، كُلُّ خَنْدَقٍ أَبَعْدُ مِمَّا بَيْنَ الْخافِقَيْنِ.
যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একদিন এ'তেকাফ করে আল্লাহ্ তার মাঝে ও জাহান্নামের আগুনের মাঝে তিনটি পরিখার দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন; যা (পৃথিবীর) পূর্ব-পশ্চিমের চেয়েও বেশি দূরত্ব।
(তাবারানী -৭৪২০)
আরেকটি বড় ফজিলত হলো শবে ক্বদর ভাগে পেয়ে যাওয়া। এ বিষয়ে আগামী সংখ্যায় আলোচনা হবে ইনশাআল্লাহ।
মুফতী আ: রউফ মাদানী হাফি.
মুহাদ্দিস
জামিয়া উসমানিয়া হোসাইনাবাদ রাজশাহী।