17/01/2019
প্রসঙ্গঃ #কিডনীরোগ #ডায়লাইসিস #স্টেমসেল
গতকাল আমার দীর্ঘদিনের পূরানো এক রোগী মারা গেলেন। মৃত মানুষের ওপর বিরক্ত হওয়া যায় না। কিন্তু তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগ পর্যন্ত আমি তার ওপর প্রচন্ড বিরক্ত ছিলাম।
শুধু আমি না, তার দুই মেয়েও বিরক্ত ছিলো।
বহু বছর ধরে তার ডায়বেটিস। চিকিৎসা তে অবহেলা করতেন। তারপর সেখান থেকে কিডনী ফেল হলো। পাত্তাই দিলেন না। গত মাসে ডায়লািসিস এর পর্যায়ে চলে গেলেন। কিন্তু তিনি ডায়লাইসিস করবেন না। কারন এগুলো নাকি ভুয়া চিকিৎসা।
গতরাতে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তার মৃত্য হলো।
তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা শেয়ার করি না, আলোচনা করি না। সব ভূয়া খবর, বাজে খবর শেয়ারে আমরা ওস্তাদ। কিডনী রোগ হওয়া এবং সেটি হলে কি করনীয় সে সম্পর্কে কয়জন ঠিকমত জানে?
বিরক্তি নিয়ে তাই দুই কলম লিখতে বসলাম। কারন কিডনী রোগী এখন প্রায় ঘরে ঘরে। বাঁচাতে হলে জানাইতে হবে। একটু পড়েন। প্লিজ।
:::::::
#কিডনী_সম্পর্কে_জ্ঞান
আপনার শরীরে দুইটা ছাকনী আছে, এদেরই নাম কিডনী।
এদের বড় কাজ হলো ২ টা,
১.
প্রতিনিয়ত আপনার রক্ত ছেঁকে ছেঁকে পরিস্কার রাখা।
সে রক্তের দূষিত জিনিস বের করে দেয় এবং গুরুত্বপূর্ন উপাদান রক্তে রেখে দেয়।
২.
কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরী করা।
অর্থাৎ সে একটা বড় ছাকনির কাজ করার সাথে সাথে হরমোন তৈরীর ও ফ্যাক্টরী হিসেবেও কাজ করে।
এই ফ্যাক্টরী তে যে সব হরমোন তৈরী হয় সেসব হরমোনের বড় কাজগুলো হলো- রক্ত তৈরী করা, ক্যালসিয়াম সাপ্লাই করা এবং ব্লাড-প্রেশার ঠিক রাখা।
::::::
#নষ্ট_হলে_কি_হবে?
কাজ যেহেতু বলে দিলাম,
এবার আপনারাই ধারনা করেন কোন কারনে আপনার কিডনী কাজ কমিয়ে দিলে আপনার কি কি হবে?
-রক্তে দূষিত পদার্থ জমবে দেখে তার ইফেক্ট পড়বে। আরুচি হবে শরীর খারাপ লাগবে।
-রক্তের প্রয়োজনীয় উপাদান ছাকনী দিয়ে বের হয়ে যাবে যার ফলে প্রয়োজনীয় উপাদানের অভাবে শরীরে নানা ধরনের ইফেক্ট হবে যার মাঝে অন্যতম হলো প্রোটিনের অভাবে পানি জমে শরীর ফুলে যাওয়া..
-রক্ত তৈরী হবে না, অর্থাৎ হিমোগ্লোবিন কমে যাবে, রক্তশূন্যতা হবে।
-ক্যালশিয়াম এর ঘাটতি হবে যার ফলে হাড়ের বিভিন্ন রোগ হবে।
- ব্লাড প্রেশার বাড়বে।
:::::::
#কিডনীতে_কি_কি_রোগ_হতে_পারে?
কিডনীর হাজারো রোগ আছে। সব রোগ মানেই যে আপনার কিডনী শেষ তা না।
কিডনীতে পাথর হয়, সিস্ট হয়, ইনফেকশন হয়, ফোড়া টাইপ রোগ হয়, AKI হয়, CKD হয়.. ইত্যাদি অনেক কিছুই হয়।
এর মাঝে অন্যতম ডেনজারাস হলো CKD নামক পরিস্থিতি। CKD এর লাস্ট স্টেজে রোগী গেলে সেখান থেকে রোগীর কিডনী কে সচল করার আর উপায় নেই।
:::::::
#কি_করা_যেতে_পারে_চিকিৎসা?
খুবই খারাপ খবর হচ্ছে যে CKD হয়ে বা অন্য কিছু হয়ে আমাদের কিডনীর কোষ যদি একবার পুরোপুরি নষ্ট হয়,
উহা আর কোনদিন ঠিক হয় না। নতুন করে কিডনীর কোষ ও গজায় না। সুতরাং একবার যদি মেশিন নষ্ট হয় তাইলে রিপেয়ারিং এর সুজোগ নেই।
তাহলে চিকিৎসা কি হবে?
আমার মনে হয় আপনারাই একটু চিন্তা করলে বলতে পারবেন।
-ছাকনী পুরোপুরি নষ্ট?- বাইরে থেকে রক্ত ফিল্টারের কাজ করে দিতে হবে। (ডায়লাইসিস)
-হরমোন তৈরী হয় না? - বাইরে থেকে হরমোন দিতে হবে। হরমোন যেসব উপাদান তৈরী করতো, সেগুলো দিতে হবে। (আয়রন ট্যাবলেট, ক্যালশিয়াম ট্যাবলেট, হরমোন ইনজেকশন)
-শরীরের প্রয়োজনীয় জিনিস বের হয়ে যাচ্ছে? - বাইরে থেকে পুশ করতে হবে। (রক্ত পুশ, প্রোটিন পুশ)
এই হলো চিকিৎসা।
বুদ্ধিমান মানুষ এসব চিকিৎসা নিয়ে কিডনী রোগের রোগী হয়েও ১৫-২০ বছর পর্যন্ত বেচে থাকে।
আর বেকুব মানুষজন, হারবাল খাবে? নাকি সিঙ্গাপুর যাবে? ডায়লাইসিস করাবে? নাকি কবিরাজ দেখাবে? কোনটা ভূয়া চিকিৎসা? কোনটা আসল চিকিৎসা..
এসব ভেবে ভেবে তর্ক বিতর্ক করতে করতে ফট করে মরে যায়।
:::::
#কেন_নষ্ট_হয়_কিডনী?
কিডনী নষ্টের কথা উঠলেই লেকচার চলে আসে আমাদের মুখে।
খাবারে ভ্যাজাল, মাছে ফর্মালিন, ফল এ কার্বাইড থেকে লেকচার শুরু করে এক্কেরে সরকার কে মা বাপ তুলে গালি দিয়ে দিয়ে আওমিলিগ বিএনপি পর্যন্ত চলে যাই।
আরে রাখেন মিয়া। আসল দিকে নজর দেন।
আমি মনে করি ঘরে ঘরে সবাই যদি ডায়বেটিস, প্রেশার এবং আরো কিছু ক্রনিক রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারে, ৫০ ভাগ কিডনী রোগী কমে যাবে।
আগে ওটায় নজর দেন ঘরে ঘরে। পরে আমিলিগ-বিম্পি দেইখে নিয়েন।
::::
#কিছু_পররিচিত_শব্দের_ব্যাখ্যা
#ডায়ালাইসিস
এই শব্দটা নিয়ে প্রচুর তর্ক বিতর্ক।
আশা করি আপনারা এখন বুঝেছেন এটা কি জিনিস?
আমি আরেকটু বলি,
কিডনী রোগ হলেই ডায়ালাইসিস লাগবে, এমন কোন কথা নেই।
যে সব কিডনী রোগীর কিডনী একেবারে সম্পূর্ণরুপে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তাদের জন্য বাইরে থেকে রক্ত ছেকে দেওয়ার উপায়ের নামই হলো ডায়লাইসিস।
ধরুন আপনার কিডনী কোন রোগের কারনে (যেমন AKI) ১-২ মাস কাজ করছে না। সেই কয়েক মাস আপনাকে ডায়লাইসিস সাপোর্ট দিয়ে বাচিয়ে রাখা হলো। কিডনী ঠিক হলে আর লাগবে না।
আবার ধরুন CKD এর শেষ স্টেজ এ গিয়ে আপনার কিডনী পুরোপুরি শেষ। তখন তো আর উপায় নেই। বাকি জীবন ডায়লাইসিস করে কাটিয়ে দিতে হবে।
সবচাইতে বিরক্তিকর প্রশ্ন, "ভাই, একবার ডায়লাইসিস শুরু করলে নাকি সারাজীবন করা লাগে?"
এ প্রশ্নের উত্তর আমি দিবো না। উপরের লেখাগুলো বুঝলে আপনারাই জানবেন যে এই প্রশ্নটাই একটা ভূল প্রশ্ন।
#কিডনী_ট্রান্সপ্লান্ট
সব সমস্যার আরেকটা সরাসরি সমাধান হলো আরেকজন একটা থেকে কিডনী নিয়ে নিজের ভিতর ফিট করা।
এটাও করে ফেলে অনেকে। বহু আগের আবিষ্কার। বাংলাদেশেও হচ্ছে।
তবে রাস্তা থেকে ধরে একজনের কিডনী ফিট করলেই হবে না। রক্তের গ্রুপ সহ আরো কিছু পরীক্ষায ডোনার কে পাশ করতে হবে। তাইলেই সম্ভব।
পরিবারের মাঝে কেউ দিলে সবচাইতে ভালো ম্যাচ হয়।
:::::
#নেক্সট_জেনারেশন_কিডনী_চিকিৎসা
১. স্টেম সেল থেরাপীঃ
ঐ যে উপরে বললাম, কিডনী কোষ একবার নষ্ট হলে আর ঠিক হয় না।
তাই যেহেতু ঠিক করা যাবেই না, সেহেতু অন্য কোন শিশু কোষ কে ট্রেনিং দিয়ে দিয়ে কিডনী কোষ হিসেবে কাজ করানো গেলে তো একটা সমাধান হয়। হয় না?
বর্তমানে এই টাইপ পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়েছে। এটার নামই স্টেম সেল থেরাপী।
যাদের এই থেরাপী সাসেসফুল হয়, তারা ধীরে ধীরে আবার ডায়লাইসিস ছাড়া এবং কম ঔষধ খেয়ে বেচে থাকতে পারে।
বাংলাদেশে হচ্ছে এখন। সাকসেস রেট শুনেছি খারাপ না। যদিও সব বড় বড় স্যারেরা এখনো পুরোপুরি সহমত পোষন করেন নি কারন এটার রিসার্চ এখনো কমপ্লিট রিসার্চ না।
২. কৃত্তিম কিডনী আবিষ্কারঃ
জ্বী, কৃত্তিম কিডনী তৈরী করা সম্ভব হয়েছে। এবং সেটা এ বছর থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে গবেষনা পর্যায়ে আছে। পরীক্ষায় সে যদি পাশ করে তাইলে সেটা হবে খুশির খবর।
কিডনী নষ্ট রোগীরা বাজারে গিয়ে দরদাম করে আর্টিফিশিয়াল কিডনী লাগিয়ে গট গট করে হেটে বাড়ি চলে আসতে পারবে।
এবং আপনারা জানেন কিনা জানি না,
প্রথম কৃত্তিম কিডনীর আবিস্কারক একজন #বাংলাদেশী।
#ডক্টর_শুভ_রায়।
জোরে বলেন "জিন্দাবাদ"
::
ছবিঃ ডক্টর শুভ রায়।
স্যারের বয়স হয়েছে তো কি হয়েছে? এখনো দেখতে আপুরা ক্রাশ খাবার মত।
তাই না??
::
Courtesy: Dr. Baapon Shahriar Parvez
শেয়ার করুন যেন মানুষ জানতে পারে। একটা মানুষ জানলেও তার উপকার হবে বা অন্য কাউকে জানাতে পারবে।