15/11/2023
গাজার শহীদদের কাফন পরান যিনি
মারাম হুমাইদ
দেইর আল-বালাহ, গাজা স্ট্রিপ। সাদা টাইলসে মোড়া ছোট একটি কামরা। ভেতরে একজন প্রৌঢ় ব্যক্তি মনোযোগ দিয়ে কাজ করছেন। ঘরের বাইরে রেলিংয়ে ঝুলছে ছোট-বড় সাদা কাফনের কাপড়।
৫৩ বছর বয়সী লোকটির নাম আবু সাহের আল-মাঘারি। একমাস ধরে গাজার আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের এই ছোট কামরাটিতে দিন-রাত কাজ করে চলেছেন বিরামহীন। এ কাজ অবশ্য তার জন্য নতুন নয়, ১৫ বছর ধরে তিনি আল-আকসা হাসপাতালে মৃত ব্যক্তিদের গোসল ও কাফনের কাজ করেন। তবে ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর তিনি যেন লাশের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছেন। আর যখন ক্ষতবিক্ষত, থেঁতলে যাওয়া, বোমায় উড়ে যাওয়া শরীরের অবশিষ্টাংশ নিয়ে কোনো লাশ আসে, তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না। প্রতিদিন তার কাছে নিয়ে আসা লাশগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আল-মাঘারি কান্নাভেজা সাদা দাড়ি মুছে বলেন, ‘আমার জীবনে আমি এত ভয়াবহ পরিস্থিতি কখনো দেখিনি। হাসপাতালের লাশ ধোয়া ও কাফন পরানোর কাজের জন্য এমনিতে প্রতিদিনই আমার কাছে ২০-৩০টি লাশ আসে। কখনো বড়জোর ৫০।
গতবার ইসরায়েলি হামলার সময়ও সর্বোচ্চ ৬০টি লাশের কাফন দিতে হয়েছিল। কিন্তু এখন আমাকে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ লাশের কাফন দিতে হয়। ইসরায়েলি হামলার ভয়াবহতায় কখনো তা ২০০ ছাড়িয়ে যায়।’
আল-মাঘারি বলছিলেন, ‘যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে যে লাশগুলো আসে, সেগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। ছিন্ন পা, পেট-বুকে গভীর ক্ষত, কোনো লাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন। এমন নৃশংসতার অভিজ্ঞতা এর আগে আর দেখিনি আমি।’
ফুলশিশুদের ছিন্ন দেহ
গাজার এই আল-আকসা শহীদ হাসপাতালটিতে এখন বেশি আসে নারী ও শিশুদের লাশ। আর তাদের মৃতদেহে বিক্ষত আঘাতগুলো এতটাই অবর্ণনীয়, আল-মাঘারি কথা বলতে পারেন না। ‘শিশুদের লাশগুলো যখন কাফনে মোড়াই, আমার হাত অবশ হয়ে যেতে চায়। কোনো শিশুর ছিন্ন পা’টা তার কাফনের ভেতরে গুঁজে দিই যাতে সেটা তার সঙ্গে কবরে যেতে পারে। ইসরায়েলিদের বর্বরতা আর কত দেখব?’
যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১০,৮০০ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছে। এর মধ্যে ৪,৪০০ শিশু এবং ২,৯০০ নারী। জাতিসংঘের মহাসচিব শিশুদের জন্য গাজাকে তুলনা করেছেন কবরস্থানের সঙ্গে। গাজার আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ আল-হাজ জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ২,৪৭৬ জন ফিলিস্তিনির মৃতদেহ গ্রহণ করেছে হাসপাতালটি। ২০০ শয্যার হাসপাতালটিতে তিল ধারণের জায়গা নেই। এ পর্যন্ত আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫,৩০০ জন ফিলিস্তিনি।
জোহরের নামাজের ছোট্ট বিরতিতে আল-মাঘারি আল বলেন, ‘ভোর ৬টা থেকে আমি শহীদদের লাশগুলো কাফন পরাতে শুরু করি, একটানা রাত ৮টা পর্যন্ত, কোনো বিরাম নেই। কয়েকদিন ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে থেকে কোনো কোনো লাশ পচে-গলে যায়, হাড় বের হয়ে যায়। কোনো লাশ খণ্ড-বিখণ্ড, কোনো লাশ এমনভাবে পুড়ে গেছে যে চেনার উপায় নেই। কোনো কোনো লাশের আঘাতগুলো একদম নতুন, আগে কখনো দেখিনি। ইসরায়েলিরা হয়তো তাদের মিসাইল ও বিস্ফোরকের মধ্যে নতুন কোনো মারণঘাতী কেমিক্যাল ব্যবহার শুরু করেছে।’
বিদায়ের হৃদয়বিদারক মুহূর্তগুলো
প্রতিদিনের মর্মন্তুদ দৃশ্যকে পেছনে ফেলে আল-মাঘারিকে চালিয়ে যেতে হয় তার কাজ। তিনি জানেন, কাফনে মোড়া এই দেহগুলোকে বিদায় জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে তাদের স্বজনরা। তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার কাজ প্রায়ই আমাকে মর্মান্তিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে। আমি জানি, আমার কামরার বাইরে সন্তানহারা দুঃখ-বেদনায় চিৎকার করে কাঁদছে মৃত শিশুটির মা-বাবা-স্বজনরা। তাদের কান্না ছাপিয়ে আমি চেষ্টা করি তাদের সন্তানের দেহটাকে উপস্থাপনের যোগ্য করে কাফনে মুড়ে দিতে, যাতে তারা তাদের সন্তানকে শেষ বিদায় জানাতে পারে।’
কান্না, রক্ত, ছিন্নভিন্ন দেহের ব্যথাভরা ভারাক্রান্ত হৃদয় একপাশে সরিয়ে রেখে আল-মাঘারিকে অফিশিয়াল কাজগুলো আঞ্জাম দিতে হয়, কাফনের গায়ে লিখতে হয় শহীদ শিশুর নাম-পরিচয়। কাফনে মোড়া শহীদ শিশুর ছিন্নভিন্ন মৃতদেহটি তুলে দেওয়া হয় তার জীবিত স্বজনের হাতে। আল-মাঘারি বলেন, ‘মৃতদেহ বিদায় জানানোর মুহূর্তগুলো সবসময় হৃদয়বিদারক আর নিষ্ঠুর হয়। কখনো কখনো আমি এমন মৃতদেহ কাফনে মুড়াই, বোমা ও শ্রাপনেলের আঘাতে যেগুলো মানুষের মৃতদেহ বলে শনাক্ত করতে কষ্ট হয়। তখন এসব মৃতদেহের কাফনের মুখ বন্ধ করে তুলে দিই তার স্বজনের হাতে।’
আল-মাঘারিকে কখনো কখনো অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই কোনো কোনো মৃতদেহে কাফনে মোড়াতে হয়। কেননা শহীদের শরীরগুলো বোমার আঘাতে এতটাই বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে, সেগুলো একত্র করে তাকে হাসপাতালের কাফন-ঘরে নেওয়াও সম্ভব হয় না।
কান্নার সময় নেই
‘প্রতিদিন এমন ছিন্নভিন্ন ও ভস্মিত মৃতদেহের কাফন পরানো, যাদের অধিকাংশই শিশু, এর জন্য কঠিন মানসিক শক্তি প্রয়োজন। যা অধিকাংশ মানুষেরই হয়তো নেই। অথচ আমাকে প্রতিদিন এই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এখানে কান্না করা বা ভেঙে পড়ার সুযোগই নেই। যদিও আমি আর দশজনের মতো সাধারণ মানুষই।’
মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক আর হৃদয়ের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতার এই কাজের মধ্যে থেকে আল-মাঘারি তার পরিবারের কথা ভাবার সুযোগই পান না, যারা মধ্য গাজা সিটির নুসাইরাত রিফিউজি ক্যাম্পে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে দিন গুজরান করছে। পাঁচ সন্তানের বাবা আল-মাঘারি পরিবার সম্পর্কে বলেন, ‘প্রত্যেক বাবার মতো আমিও আমার পরিবারের ব্যাপারে দুশ্চিন্তায় থাকি। কিন্তু রাতে যখন আমি কাজ শেষ করে তাদের কাছে যাই তখন তাদের সঙ্গে কথা বলার মতো সাহস পাই না। আমি তাদের শুধু বলি, আমাকে একা থাকতে দাও। যদিও জানি তারা আমাকে সারা দিন মিস করেছে, কিন্তু তাদের স্নেহ-ভালোবাসা দেওয়ার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না আমার হৃদয়ে।’
ইসরায়েলি মিসাইল ও বোমা হামলা প্রতিনিয়ত চলছে। আল-মাঘারি জানেন, ইসরায়েলি হামলা যে কোনোদিন হয়তো তার পরিবারের ওপরও উড়ে আসতে পারে। তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো আমি চিন্তা করি, বোমা হামলায় হয়তো আমার সন্তান নিহত হলো আর তার ছিন্নভিন্ন দেহ নিয়ে আসা হলো আমার কাছে। তাকে কাফনে মুড়িয়ে কবরে শুইয়ে দিয়ে আসব। এমনটা হতেই পারে। কেননা ব্যতিক্রম বাদে, গাজায় সবাই ইসরায়েলের নিশানায় সমান।’
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর