13/06/2014
শবেবরাত বছরের পবিত্র রজনীগুলোর অন্যতম একটি রাত। এই রাতের ফজিলত ও মর্যাদা অপরিসীম। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় সাহাবি হজরত আলী (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন শাবান মাসের পনেরতম রাত আসে, তখন তোমরা রাতে নামাজ পড়ো এবং দিনে রোজা রাখো। কেননা আল্লাহ তায়ালা সেদিন সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার আসমানে আসেন এবং বলতে থাকেন, কেউ আছে কি গুনাহ মাফ চাইবে? আমি তার গুনাহ মাফ করে দেব। কেউ আছে কি রিজিক চাইবে? আমি তাকে রিজিক দান করব। কেউ আছে কি অসুস্থ, আমি তাকে সুস্থ করে দেব। আল্লাহ পাক এভাবে ডাকতে থাকেন ভোর পর্যন্ত (ইবনে মাজাহ)। অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, একদিন রাসুল (সা.) বললেন, আজকের রাতে (শবেবরাতে) কী কী হয়, তোমরা কি জানো? আয়েশা (রা.) বললেন, আপনি বলুন এই রাতে কী কী হয়? রাসুল (সা.) বললেন, আজকের রাতে আগামী এক বছরে পৃথিবীতে আগমনকারী আদম সন্তানদের নাম লেখা হয়। আগামী এক বছরে পৃথিবী থেকে কে কে বিদায় নেবে, তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। এই রাতে মানুষের আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। মানুষের রিজিক আল্লাহর কাছ থেকে বরাদ্দ হয় (বায়হাকি)।
পবিত্র শবেবরাতে আমরা যেসব আমল করতে পারি
পবিত্র শবেবরাতে আমাদের উচিত, সারা রাত বিভিন্ন নেক আমল করে কাটিয়ে দেওয়া, জিকির করা, কোরআন তেলাওয়াত করা, নফল নামাজ পড়া। সম্ভব হলে সালাতুস তাসবীহ নামাজ পড়া। যেসব আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে তাদের কবর জিয়ারত করা। অন্যান্য রাতের তুলনায় শবেবরাতে যেহেতু রাত জাগরণ বেশি হয়, তাই সালাতুত-তাসবীহ নামের ফজিলতপূর্ণ নামাজটি এ রাতে পড়া যেতে পারে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) তাঁর চাচা হজরত আব্বাস (রা.)-কে বলেছিলেন, "চাচা পারলে আপনি সালাতুস তাসবিহ নামাজ সপ্তাহে একবার, তা না পারলে মাসে একবার, তাও না পারলে বছরে একবার পড়বেন। অন্তত জীবনে একবার হলেও এই নামাজ পড়বেন। এ নামাজ দ্বারা জীবনের সগিরা, কবিরা, ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত, নতুন, পুরাতন, গোপন, প্রকাশ্য সব রকম গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'
এই নামাজ পড়ার জন্য শবেবরাত হলো উপযুক্ত সময়। এখন সালাতুত-তাসবিহ নামাজ পড়ার নিয়মাবলি আমরা জেনে নিতে পারি। সালাত শব্দের অর্থ নামাজ। আর তাসবিহ শব্দ দ্বারা এখানে 'সুবাহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার' এই তাসবিহকে বোঝানো হয়েছে। সুতরাং যেই নামাজে এই তাসবিহ পড়া হয়, তাকে সালাতুস তাসবিহ নামাজ বলে। এই নামাজ চার রাকাত। প্রত্যেক রাকাতে ওই তাসবিহ ৭৫ বার পড়তে হয়। তাহলে চার রাকাতে মোট ৩০০ বার হয়। সালাতুত তাসবিহ নামাজ পড়ার দুটি নিয়ম আছে। প্রথম নিয়মটি হলো- নিয়ত করবে, আমি চার রাকাত সালাতুত তাসবিহ নফল নামাজ পড়ার নিয়ত করলাম। তারপর সানা অর্থাৎ সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা...এটা পড়বে। তারপর সুরা ফাতিহা পড়বে। এর সঙ্গে যেকোনো একটি সুরা মিলাবে। সুরা শেষ করে ওই দাঁড়ানো অবস্থায়ই ১৫ বার সেই তাসবিহ পাঠ করবে। এরপর আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যাবে। রুকুর তাসবিহ পড়ার পর আবার ওই তাসবিহ ১০ বার পড়বে। তারপর রুকু থেকে উঠে 'রাব্বানা লাকাল হামদ" বলার পর আবার ওই তাসবিহ ১০ বার পড়বে। তারপর সিজদায় যাবে। সিজদার তাসবিহ পড়ার পর তাসবিহ ১০ বার পড়বে। সিজদা থেকে উঠে দুই সিজদার মাঝখানে আবার ১০ বার পড়বে। দ্বিতীয় সিজদায় তাসবিহ পড়ার পর আবার ওই তাসবিহ ১০ বার পড়বে। এ হলো ৬৫ বার। এখন আবার আল্লাহু আকবার বলে দ্বিতীয় সিজদা থেকে উঠে বসে ১০ বার পড়বে। এরপর দাঁড়াবে। এ হলো এক রাকাতে ৭৫ বার। এবার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে একইভাবে পড়তে হবে। দ্বিতীয় রাকাতে ও শেষ রাকাতে আত্তাহিয়্যাতু পড়ার আগে ১০ বার তাসবিহ পড়ে নিতে হবে। কোনোভাবেই আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর তাসবিহ পড়া যাবে না এবং কোনোভাবেই প্রতি রাকাতে ৭৫ বারের বেশি পড়া যাবে না।
দ্বিতীয় নিয়ম হলো- নিয়ত বেঁধেই সানা পড়ার পর সুরা কেরাত পড়ার আগেই ১৫ বার, সুরা কেরাত শেষে ১০ বার। এখানে দাঁড়ানো অবস্থায় ১০ বার বেশি হয়ে গেলে। এই নিয়মে পড়লে দ্বিতীয় সিজদা থেকে সোজা দাঁড়িয়ে যাবে। দ্বিতীয় সিজদায়ই ৭৫ বার হয়ে যাবে এবং আত্তাহিয়্যাতু পড়ার আগে ওই তাসবিহ পড়তে হবে না। তাসবিহ ৩০০ বার হতে হবে, কম হলে সালাতুত তাসবিহর ফজিলত পাওয়া যাবে না। তাই খুব সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হবে। যদি কেউ কোনো জায়গায় তাসবিহ পড়তে ভুলে যায় বা কম থেকে যায়, তাহলে পরবর্তী সময়ে যে জায়গায় মনে আসবে, সেখানে ছুটে যাওয়াটাও আদায় করে নেবে। সালাতুত তাসবিহ নামাজ যেকোনো সুরা দিয়ে পড়া যায়। তবে কেউ কেউ বলেছেন, এ নামাজে সুরা আছর, কাউছার, কাফেরুন ও ইখলাছ পড়া উত্তম। সালাতুত তাসবিহ ছাড়া এমন আরো যত নফল নামাজ আছে, তা যেকোনো সুরা দিয়ে পড়া যেতে পারে।
আমাদের সমাজে পবিত্র শবেবরাতে হালুয়া রুটির উৎসব হয়। আতশবাজি, পটকা ইত্যাদি ফোটানো হয়। দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জা করা হয়। এগুলো কোনোভাবেই শরিয়তসম্মত নয়। পুণ্যময় এই রাতে ইবাদত না করে আনন্দ উৎসব কঠিন গুনাহের কাজ এবং ইসলাম তা কোনোভাবেই সমর্থন করে না। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এগুলো থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন।