16/06/2026
“এক সময় কর্পোরেট জগতের স্বপ্ন দেখতাম, আজ স্বপ্ন দেখি কুরআনের খাদিমা হওয়ার।”
"নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন বা জীবনব্যবস্হা হলো ইসলাম"-সূরা: আলে ইমরান ৩:১৯। আমি শুকরিয়া আদায় করছি আল্লাহ আমাকে মুসলিম হিসেবে এবং শেষ নবি ﷺ এর উম্মত হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ।
মুসলিম পরিবারে যেহেতু জন্ম তাই নামাজ পড়ছি, রোজা রাখছি, হালাল-হারাম মেনে চলার চেষ্টা করছি কিন্তু কোনো কিছুর মধ্যেই আমার ধারাবাহিকতা ছিল না!!
রাসুল ﷺ বলেছেন, "আল্লাহর কাছে প্রিয় কাজ হলো- যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প। "এই যে আল্লাহর কাজগুলো নিয়মিত করছি না! অবাধ্যতায় এবং নাফরমানিতে দিন কেটে যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, বছর যাচ্ছে... তবুও তো আমার রব তাঁর নিয়ামত থেকে এই অধমকে বঞ্চিত করেন নি! রাসুল ﷺ বলেছেন, "যাকে আল্লাহ হেদায়েত দেন, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না; আর যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন, কেউ তাকে হেদায়েত দিতে পারে না"।
আমার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবো কিন্তু হতে পারি নি। তারপর বিভাগ পরিবর্তন করলাম সুযোগ আসলো ইংরেজি নয়তো হিসাববিজ্ঞান যেকোনো একটা বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করার। আমার চোখে মুখে তখন রঙিন স্বপ্ন। কর্পোরেট দুনিয়ার হাতছানি।
সিদ্ধান্ত নিলাম হিসাববিজ্ঞানে পড়বো। কর্পোরেট জব করবো। কর্পোরেট দাপিয়ে বেড়াবো। আমার স্বপ্ন অনুযায়ী অত্যন্ত সুপরিচিত দুটো প্রতিষ্ঠানে আল্লাহ রব্বুল আলামীন জব করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
আমি বরাবরই শান্ত, ধীর-স্থির এবং শালিন ছিলাম। আমার স্বপ্ন অনুযায়ী ভালো জব, ভালো সম্মানী, ভালো পরিবেশ আরও উঁচুতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ আল্লাহ আমাকে দিয়েছিলেন। কোনো কিছুই আমাকে মানসিক শান্তি দিচ্ছিল না!কাজ ভালোই করতাম কিন্তু কেনো যেনো এই জীবন আমার মনপুত হচ্ছিল না। কোথাও একটা শূন্যতা অনুভব করছিলাম। কিছুই ভালো লাগছিল না। বেশ অনেকগুলো বছর জব করার পর। কর্পোরেট জব ছেড়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলাম। শিক্ষকতা পেশার সহায়ক হিসেবে বিএড ডিগ্রি এবং কিছু ট্রেনিং করলাম। এভাবেই সময় কেটে যাচ্ছিল।
করোনার এক বছর আগে হঠাৎ করে সম্পূর্ণ এক মাস প্রতিদিন রাত ৩:০০ টায় আমার ঘুম ভেঙে যেত। কোনোভাবেই আর ঘুম আসতো না!! আমি অনেকটা বিরক্তি নিয়ে আমার মাকে জানাই কিন্তু মা সেভাবে গুরুত্ব দেন নি। যদিও ঐ সময় আমি বুঝতে পারিনি আসলে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য আমার রব আমাকে প্রতিদিন ঘুম থেকে ডেকে তুলছিলেন, আলহামদুলিল্লাহ!!
২০২০ সাল করোনার কারনে চারদিকে লকডাউন। অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছি। রাত-দিন খবর দেখছি আর মৃত্যুর মিছিল দেখছি!! তখন আমার মনের মধ্যে আতঙ্ক ঢুকে গেল যে রোগ বা জীবাণু দেখা যাচ্ছে না কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে! সে জীবাণুর ভয়ে আমরা ঘরে আবদ্ধ থাকি!! অনিশ্চিত জীবন!! মৃত্যুর ভয়!!
করোনার মধ্যেই ভাইয়ের ঠান্ডা জনিত কারনে ফুসফুসে পানি জমে গেল হাসপাতালে করোনা রোগীদের সাথে বেশ কত দিন ওকে নিয়ে কাটাতে হলো! মা করোনা আক্রান্ত হলেন, বোনের স্বামী এবং আমার অনেক নিকট আত্মীয়ের মধ্যে অনেকে করোনা আক্রান্ত হলেন। করোনাকালীন সময় জব করে বেতন প্রথমে অর্ধেক, তারপর চারভাগের এক ভাগ পাচ্ছিলাম! আমার অনেক কলিগ এর জব চলে গেল!
আমার নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগছিল! ঐ সময় নামাজ পড়তাম আর সিজদাতে যেয়ে আল্লাহকে বলতাম, "আমাকে এমনভাবে পরিবর্তন করে দিন যেভাবে থাকলে আপনি আমার উপর সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট থাকবেন।"
"আমি বান্দার খুব নিকটে আছি; যখন সে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দেই।"সূরা বাকারা ২:১৮৬।
আমার রব আমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। আমাকে হেদায়েতের অমিয় সুধা পান করার তাওফিক দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ
পর্দা করার জন্য কালো বোরকা এবং হিজাব কিনলাম। সাজগোজ করা একে বারেই বন্ধ করেদিলাম। ধীরে ধীরে হাত মোজা, পা মোজা এবং নিকাব সংযুক্ত হলো আমার পর্দার অনুষঙ্গে। পর্দার গুরুত্ব অনুধাবন করলাম। আগে কেন পর্দা করিনি সেজন্য মনের মধ্যে আফসোস অনুভব করছিলাম। আমার মা কতবার বুঝিয়েছিলেন বোরকা না পরি অন্তত যাতে হিজাব পরে থাকি, যাতে চুলগুলো ঢেকে রাখি। আমি আমার মা এর কথা আমলেই নেই নি! চারপাশে মানুষকে পর্দা করতে দেখতাম কিন্তু পর্দা যে আমার রবের ফরজ বিধান এটাই আমার জানা ছিল না! পর্দার ব্যাপারে আমার বোধই কাজ করেনি! আফসোস!! এত দেরি করে উপলব্ধি হলো!! আমার বুক সেলফে কুরআনের অনুবাদ, তাফসীর, সীরাহ গ্রন্থ এবং অন্যান্য ইসলামিক বইয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে লাগলো। কুরআন ও সুন্নাহর অনুশাসন মেনে চলার চেষ্টা করতে শুরু করলাম!
"এবং তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে; প্রাচীন জাহেলী যুগের মতো নিজকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। "সূরা আল-আহযাব ৩৩:৩৩।
বারবারই আমার রবের এই বাণী আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো। আমার রব হেদায়েত দিয়েছেন পরীক্ষা নিবেন না তাই কী হয়!
শুরু হলো দ্বীনের পথে টিকে থাকার লড়াই-চারদিকে ফিতনাময় পরিবেশে দ্বীনের মধ্যে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়লো! সাজগোজ না করা, হারাম গান-বাজনা, প্রচার প্রসারের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি আপলোড না করা, জন্মদিন উদযাপন করাকে এড়িয়ে যাওয়া, শহীদ দিবসে বেদীতে ফুল না দেওয়া, গীবতকে প্রশ্রয় না দেওয়া, আমার শিক্ষার্থী এবং সহকর্মীদের দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো আমার সহকর্মী আর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি। তারা আমার এ পরিবর্তনকে ভালোভাবে নেয় নি। তাদের স্মার্ট পরিবেশে আমি বড্ড বেমানান হয়ে গেলাম। আমার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের এবং কর্তৃপক্ষের অভিযোগের পাহাড় জমা হতে লাগলো। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অযুহাতে আমাকে ডেকে নিয়ে হেনস্তা করতে থাকলেন।
কুরআনের প্রতি ছোট বেলা থেকেই আমার ভীষণ দুর্বলতা ছিল। হঠাৎ করেই মনের মধ্যে কুরআন হিফজ করার তাগিদ অনুভব করছিলাম। এই তাগিদ আমাকে অস্থির করে তুলছিল!এ অদৃশ্য হাতছানি ছিল একান্তই আমার রবের ফয়সালা, আলহামদুলিল্লাহ।
সে লক্ষ্যেই খোঁজ-খবর নিচ্ছিলাম। অনলাইনে খুঁজতে যেয়ে IOM এর পেইজের সন্ধান পেলাম। IOM এর কিছু ভাই-বোনদের রিভিউ এবং দ্বীনে ফিরে আসার গল্পগুলো পড়লাম, যা আমাকে IOM সম্পর্কে অনুপ্রাণিত করলো। সম্পূর্ণ কুরআন হিফয সম্পর্কে IOM এর মেসেঞ্জারে তথ্য নিলাম। IOM থেকে আমাকে ৬ মাসের কোর্সের কথা জানালেন তাই এখানে হিফযে ভর্তি হওয়া হলো না!আমি আশাহত হলাম! তাও আমি প্রতিদিনই IOM এর অনলাইন পেইজে স্কুল করতাম!
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ
"অতএব তোমরা উভয়ে (জিন ও মানুষ) তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন অনুগ্রহ/নিয়ামত অস্বীকার করবে?" সূরা :আর-রহমান
ঐ যে আমার রব আমাকে একা করে দিয়েছিলেন এর মাঝে উনি আমাকে বিশেষ বিশেষ কিছু নিয়ামত দান করলেন যা আমার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল!! প্রতিটি নিয়ামতই একান্ত আমার আর আমার রবের মধ্যে আমৃত্যু বিরাজমান থাকুক।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আমার ভীষণ ইচ্ছে হলো আলিম কোর্সে ভর্তি হই কিন্তু কর্মমুখর দিনগুলোতে সময়ের বড্ড অভাব! আমি আমার রবের কাছে সময়ের বরকত চাইলাম। আমার রব আমাকে নিরাশ করেন নি। অবশেষে ২৬১৫ ব্যাচে আলিম কোর্সের জন্য রব্বে কারীম আমাকে মনোনীত করলেন। আমি আমার কাঙ্খিত প্রতিষ্ঠান IOM এ ভর্তি হলাম, আলহামদুলিল্লাহ। এটা আমার রবের পক্ষ হতে আমার প্রতি দয়া, করুণা এবং নিয়ামত।
দ্বীনের পথে ফিরে আসার পরীক্ষা দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর ধরে তাওয়াক্কুলের সাথে দিচ্ছিলাম! কাজের জায়গায় দুনিয়াবি পদমর্যাদা ছেড়ে দিয়েছি, যে বিষয়ে ভালো পড়াতে পারতাম সেটা ছেড়ে দিয়েছি তবুও কেন যেন কাউকে খুশি করতে পারছিলাম নাহ। চারদিক থেকে একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তবুও অবহেলা আর অসম্মান আমার পিছু ছাড় ছিল নাহ। আমার পৃথিবীটা ক্রমশ ছোট থেকে ছোট হতে লাগলো।
মুসলিম দেশ কিন্তু পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদেরকে করায়ত্ত করে রেখেছে। আমরা অবুঝের মতো সেই দিকেই ধাবিত হচ্ছি। কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই!! দূষিত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি! নামাজের সিজদাতে আল্লাহর কাছে মিনতি জানালাম এই জুলুম এবং অসম্মান হতে আমাকে রক্ষা করেন।
এক সময় যেখানে ছিল আমার ঈর্ষণীয় দাপট। সেখানেই আমাকে আখ্যা দেওয়া হলো কাজের জায়গার পরিবেশ নষ্ট করছি ! এটা মাদ্রাসা না!! এখানে এরকম চলবে না!! হারাম গান-বাজনায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, জন্মদিন উদযাপনে পিছনে দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে হাততালি দিতে হবে, মাস্ক পরে হলেও শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছবি তুলতে হবে!! অবশেষে ২০২৬ এর জানুয়ারির ৮ তারিখ ফিতনাময় পরিবেশের জবটা ছেড়ে দিয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।
এই যে এত সব ঘটনা কোনো কিছুই এমনি এমনি ঘটেনি সবকিছুই আমার রবের সর্বোত্তম পরিকল্পনার অংশ। আমাকে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস।" আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। "দ্বীনের পথে অটল থাকার জন্য আমাদেরকে সর্বদা আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে সাহায্য চাইতে হবে।
"হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর অবিচল রাখুন।"
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِيعَلَى دِينِكَ
ইলমের নূর নিজের অন্তরে ধারণ করে সেটাকে আমলে পরিবর্তন করতে হবে। নিজের পরিবার-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সর্বোপরি মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে কাজ করতে হবে। আল্লাহ আমাকে আফিয়াহ্, খইর এবং আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে কুরআনের খাদিমা এবং নবীজী ﷺ এর সীরাহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মুসলিম উম্মাহর মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার তাওফিক দান করুক। চলুন সবাই মিলে দ্বীনের পথে অটল থেকে আল্লাহর রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নেই। আল্লাহ আমাদের ইলমে, আমলে বরকত দিক। আমাদের নফস হোক দুর্গন্ধমুক্ত। অন্তর হোক সালাতের সুগন্ধিযুক্ত। ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হই সকলে। আল্লাহ আমাদেরকে দুনিয়াবিমুখ করে আখিরাতমুখী করে দিক। আল্লাহুম্মা আমীন ইয়া রব্বুল আলামীন।
- ২৬১৫ ব্যাচের এক বোনের দ্বীনে ফেরার গল্প