26/10/2025
ছঠ পুজা
ছঠ পূজা হিন্দু বর্ষপঞ্জীর কার্তিক মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে উদযাপিত একটি প্রাচীন হিন্দু পার্বণ।সূর্য্যোপাসনার এই অনুপম লৌকিক উৎসব পূর্ব ভারতের বিহার, ঝাড়খণ্ড,পূর্ব উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে এবং নেপালের তরাই অঞ্চলে পালিত হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে এই পার্বণ প্রবাসী ভারতীয়দের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত হয়েছে। ছট পূজা সূর্য ও ষষ্ঠী দেবীর (ছটী মাঈ) প্রতি সমর্পিত হয়, যেখানে তাকে পৃথিবীতে জীবনের স্রোত বহাল রাখার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন ও আশীর্বাদ প্রদানের কামনা করা হয়। ছটে কোনও মূর্তি পূজা করা হয় না।
এই পূজার কখন উৎপত্তি হয়েছিল তার কোনো স্পষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায় না।
রামায়ণের আছে রাবণ বধের পর ব্রাহ্মণ হত্যার পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য রাম এবং সীতা রামের কুল দেবতা সূর্যের পুজা করেছিলেন, দ্রৌপদী ধম্য ঋষির উপদেশ মতে সূর্য্যকে আরাধনা করে অক্ষয় পাত্র লাভ করেছিলেন। সঙ্গে মহাবীর কর্ণের কোমর পর্যন্ত জলে নেমে সূর্য্যের উপাসনা করা উল্লেখ আছে। আজও ছট পূজা উদ্যাপন করা সকল মানুষকে কোমর পর্যন্ত জলে নেমে সূর্য বন্দনা করতে দেখা যায়। অন্য এক আখ্যান মতে
পাণ্ডু ঋষি হত্যার পাপের প্রায়শ্চিত্তের কারণে পত্নী কুন্তীর সঙ্গে বনে থাকায় পুত্র প্রাপ্তির জন্য সরস্বতী নদীর পারে সূর্য্য উপাসনা এবং ব্রত করেছিলেন।
পুরাণ মতে, প্রথম মনু প্রিয়বতের কোনো সন্তান ছিল না। তাই তার পিতা কাশ্যপ মুনি পুত্রেষ্ঠী যজ্ঞ করতে পরামর্শ দেন। এর ফলে তার পত্নী মালিনী একটি মৃত পুত্র জন্ম দিলেন। মৃত শিশু দেখে তারাও বিলাপ করতে থাকায় আকাশ থেকে এক দিব্য কন্যা প্রকট হলেন। তিনি নিজকে ব্রহ্মার মানস পুত্রী বলে পরিচয় দিলেন এবং মৃত পুত্রকে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে সে জীবিত হয়ে উঠল। এখনও ঊষা দেবী বা ছটি মায়ের মূর্তি কোলে কিছু থাকা অবস্থায় কল্পনা করা হয় এবং পুত্র প্রাপ্তির জন্য ব্রত উপাসনা করা হয়।
ছট পূজায় কোনো মূর্তি উপাসনার স্থান নেই। এতে অস্তগামী সূর্য এবং উদিত সূর্যকে পূজা করা হয়। আজকাল পূজা অনুষ্ঠিত করা কমিটিগুলিকে সকল ঘাটের কাছে সূর্যের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে দেখা যায়। পূজার দুদিন আগে লাউ ভাত এবং একদিন আগে দুধ-ভাত খাওয়ার পর, ৩৬ ঘণ্টার এক কঠোর ব্রত পালন করতে হয়। পূজায় সম্পূর্ণ সাত্বিক নৈবেদ্য ইত্যাদি কুলো, ডালা বা পাচিতে রেখে উৎসর্গ করা হয়। বিভিন্ন ফলমূল, মিষ্টি ইত্যাদির সঙ্গে পরম্পরাগত বিহারী লোকখাদ্য "ঠেকুয়া" প্রস্তুত করে নৈবেদ্যরূপে প্রদান করা হয়।এই সময় নুন-মশলাবর্জিত সম্পূর্ণ নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করা হয়। পূজার শেষে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীদের প্রসাদ বিতরণ এই পূজার অন্যতম নিয়ম। এই পূজায় অনেককে বাগরি নদীর ঘাটে গিয়ে পূজা করার দৃশ্যও দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে এই পূজা এক সর্বজনীন রূপ পেয়েছে। বিভিন্ন ভাষাভাষী, ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ এই পূজার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করে পূজায় সামিল হতে শুরু করেছেন।
চারদিনের এই ব্রতের প্রথম দিনে ব্রতধারী বাড়িঘর পরিষ্কার করে স্নান সেরে শুদ্ধাচারে নিরামিষ ভোজন করেন (যাকে নহায়-খায় বলা হয়)।পরদিন থেকে উপবাস শুরু হয়; ব্রতী দিনভর নির্জলা উপবাস পালনের পর সন্ধ্যায় পুজোর শেষে ক্ষীরের ভোগ গ্রহণ করেন (এটি খরনা নামে পরিচিত)। তৃতীয় দিনে নিকটবর্তী নদী বা জলাশয়ের ঘাটে গিয়ে অন্যান্য ব্রতীর সাথে অস্তগামী সূর্যকে অর্ঘ্য অর্থাৎ দুধ অর্পণ করা হয়। ব্রতের শেষদিনে পুনরায় ঘাটে গিয়ে উদীয়মান সূর্যকে পবিত্র চিত্তে অর্ঘ্যপ্রদানের পর উপবাসভঙ্গ করে পূজার প্রসাদরূপে বাঁশ নির্মিত পাত্রে সুপ, গুড়, মিষ্টান্ন, ক্ষীর, ঠেকুয়া, ভাতের নাড়ু এবং আখ, কলা, ভেজা ছোলা গোটা মুগ, বাতাবী লেবু প্রভৃতি ফল জনসাধারণকে দেওয়া হয়।ঠেকুয়া হোলো প্রধান প্রসাদ, এই সময় অনেকে যারা গরীব তারা ছট পুজোর জন্য মানুষের কাছে কুলো হাতে সাহায্য চায় এবং সবাই হাদিমুখে দান করে।
আজ ছট পুজার প্রথম দিন আজ ব্রতী স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্রে নতুন উনুনে শুদ্ধ বাসনে লাউ ছোলার ডালের তরকারি বানিয়ে একবার খাবে, আগামী কাল সারাদিন উপোস থেকে রাতে ক্ষীর ( পায়েস) খাবে, এই চারদিন কারো বাড়তে আমীষ রান্না হবে না, এই দুই দিন আত্মীয় পরিজন পাড়া পড়শী দের নিমন্ত্রণ করে লাউ ভাত এবং ক্ষীর রুটি কাওয়ানো হয়ে থাকে, আমার ছোটোবেলা প্রায়ই বিহারে কেটেছে কারণ আমার দাদু ( মায়ের বাবা) রেলে চাকরি করতেন উনি ৩২ বছর গোমোতে ছিলেন, এখন অবশ্য গোমো ঝারখন্ডে পড়ে, তাই আমি সব নিয়ম জানি, অনেকে ঘর থেকে নদী বা পুকুর পর্যন্ত দন্ডি কেটে যায়, অস্তগামী সূর্যের র পুজোর পর সারারাত ওই নদী বা পুকুরের ধারে বসে থাকে, সারারাত ধরে ছঠী মাঈয়ার গান গায় ভোরে উদিত সূর্যের পুজো করে অর্ঘ দেয়। এই চারদিন ব্রতী বিছানায় শোয় না, মাটিতে কম্বল পেতে শোয়, এয়ার ফোর্সে থাকতেও ছট পুজোয় থাকতাম, দিল্লিতে এই সময় বিভিন্ন বাজার ভরা থাকে সূপ মানে কুলো ওদের কুলো আমাদের বাঙালী দের থেকে আলাদা দেখতে হয়, ঝুড়ি, বিভিন্ন রকমের ফল, আখ যাবতীয় ছটের উপকরণ এ ভরা থাকে।, তাই ছট পুজো আমার অতি পরিচিত পুজো।
সবাইকে ছঠ পুজোর অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই।