27/10/2026
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা তার পুরো জীবনকে বদলে দেয়। পেছনে তাকালে আমি অনুভব করি—আমার জীবনেও এমন একটি পরিবর্তনের পথ ছিল, যা ধীরে ধীরে আমাকে দ্বীনের দিকে ফিরিয়ে এনেছে।
ছোটবেলা থেকেই দ্বীনের প্রতি আমার এক ধরনের ভালোবাসা ছিল। মনে মনে চাইতাম—আমি যেন একজন ভালো মুসলিম হতে পারি, আল্লাহর কাছে প্রিয় হতে পারি। সব সময় আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতাম, যেন তিনি আমাকে হেদায়েত দান করেন এবং দ্বীনের পথে কবুল করেন। কিন্তু সেই চাওয়াটা সবসময় বাস্তবতায় রূপ নিত না। কখনো চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয়নি। আবার কখনো হেরে গিয়েছি নিজের নফস কাছে। কখনো পরিবেশ পরিস্থিতির কাছে। এভাবেই দ্বীনের প্রতি টান থাকা সত্ত্বেও বারবার দূরে সরে যাচ্ছিলাম। জীবনের অনেকটা সময় ভুলের মাঝে কাটিয়েছি। কখনো দ্বীনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, আবার কখনো দূরে সরে যাওয়ার মধ্য দিয়েই সময় পার হচ্ছিল। মনে হতো—আমি চাই, কিন্তু পারছি না। এই "চাই" আর "পারছি না"-এর মাঝেই অনেকটা সময় কেটে যাচ্ছিল।
কিন্তু আল্লাহ যখন কাউকে নিজের দিকে ডাকেন, তখন সেই ডাক কোনো না কোনোভাবে পৌঁছে যায়। আমার জীবনেও সেই ডাক এসেছিল খুব সাধারণ একটি মাধ্যমে—একটি অনলাইন তালিম। দেখলাম, কিছু বোন অধীর আগ্রহে মাসিক একটি তালিমের জন্য অপেক্ষা করছেন। কৌতুহলবশত আমিও একদিন সেদিন শুনলাম। আর সেই শোনাটাই যেন আমার অন্তরের ভেতর এক আলো জ্বালিয়ে দিল। উস্তাজার প্রতিটি কথা হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
এরপর থেকে আমি নিয়মিত সেই তালিম শোনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। যতই শুনতাম, ততই বুঝতে পারতাম—আমি আসলে কত কিছু জানি না, আর জানার কত প্রয়োজন। তিন-চার মাস শোনার পর আমার ভেতরে অনুভূতি জাগলো—আমি শুধু শুনে থেমে থাকতে চাই না, আমি জানতে চাই, বুঝতে চাই, শিখতে চাই। ধীরে ধীরে আমার ভেতরে ইলম অর্জনের প্রবল ইচ্ছা জন্ম নিল। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো, যেগুলো একজন মুসলিমের জানা অত্যন্ত জরুরি, সেগুলো শেখার প্রয়োজনীয়তা তখন খুব তীব্রভাবে অনুভব করলাম। ইসলাম সম্পর্কে আরো জানার আরো জ্ঞান অর্জনের তীব্র ইচ্ছা আমার অন্তরে জেগে উঠল।
ফেসবুকের বিভিন্ন ইসলামিক তালিম গ্রুপে খুঁজে খুঁজে যুক্ত হতাম, সাপ্তাহিক তালিম শুনতে লাগলাম। এক সময় একটি গ্রুপে "৪০ দিনের দোয়া কবুলের চ্যালেঞ্জ"-এ অংশ নিলাম। সেখানে দেওয়া প্রতিদিনের জিকিরগুলো নিয়মিত পড়তাম। তখনই প্রথম উপলব্ধি করলাম—যখন জবান আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত থাকে, তখন হৃদয় এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে যায়, দুনিয়াবি টেনশন কম হয়। পরবর্তীতে তাহাজ্জুদ গ্রুপে যোগ দিলাম, তাহাজ্জুদে আগ্রহী থাকলে উনারা কল দিয়ে ডেকে দেয়। এই গ্রুপে তালিম করানো আপু একদিন বললেন যে তিনি জেনারেল পড়াশোনা করেও, অনলাইনে আলেমা কোর্স করছেন। সেই কথা আমার অন্তরে গভীরভাবে নাড়া দিল। তখন আমার মনে হলো—যেহেতু আমি মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পাইনি, যদি অনলাইনে কোনো মাদ্রাসায় ইসলাম সম্পর্কে শেখার সুযোগ পেতাম, তাহলে তা আমার জন্য অনেক বড় একটি নেয়ামত হতো। তাই অনলাইনে খুঁজতে শুরু করলাম কোথায় আলেমা কোর্স করলে ভালো হবে।
এরপর খুঁজতে খুঁজতে একদিন IOM-এর কথা জানতে পারলাম। প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম—আমি কি পারব? আমার দ্বারা কি সম্ভব হবে? আমি ইস্তিখারা নামাজ পড়লাম, আল্লাহর উপর ভরসা করলাম, এবং অবশেষে সাহস করে ভর্তি হয়ে গেলাম।
দ্বীনের পথে চলা যে সহজ নয়, তা আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছি। বুঝলাম এটা শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি চলমান সংগ্রাম। এই পথে আসার পর বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো নিজের নফসের সাথে লড়াই করতে হয়েছে, আবার কখনো আশেপাশের মানুষের নানা কথা শুনতে হয়েছে। অনেক সময় এমন কথাও শুনতে হয়েছে, যা হৃদয়কে ব্যথিত করেছে। মাঝে মাঝে মন ভেঙে গেছে, কিন্তু আবার নিজেকে সামলে নিয়েছি।
তবুও আমি মনে করি, দ্বীনের পথে চলার জন্য এসব ধৈর্য ধরে সহ্য করা দরকার। কারণ আমি বুঝেছি—এই পথ সহজ না হলেও, এই পথই সত্যের পথ। এই পথেই রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি, এই পথেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির আশায় ধীরে ধীরে নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছি। আমার রবের অশেষ শুকরিয়া, যিনি আমাকে ডেকেছেন, ফিরিয়ে নিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন। আমাকে এই পথে চলার তাওফিক দিয়েছেন। আমি এখনও শিখছি, এখনও চেষ্টা করছি, এখনও নিজেকে পরিবর্তন করার পথে আছি।
আজ আমি গভীর কৃতজ্ঞতায় মহান রবের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি—আলহামদুলিল্লাহ, যার অশেষ রহমতে আমার মতো একজন নগণ্য গুনাহগার বান্দী এই প্লাটফর্মের ত্বলিবা হয়ে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ পেয়েছি।
আমার অন্তরের একটাই দোয়া—
আল্লাহ তাআলা যেন আমাকে এই পথ থেকে কখনো বিচ্যুত না করেন, আমাকে হেদায়েতের উপর অটল রাখেন এবং ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করেন।
আমীন
-- ২৬১৫ ব্যাচের এক ত্বলিবে ইলমের দ্বীনে ফেরার গল্প।